ছবি: Ifthekhar Omer, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

ভ্রমণের প্রস্তুতি

সিলেটে যাওয়া ও বিভাগজুড়ে ঘোরাফেরা

পড়তে ১২ মিনিট · হালনাগাদ ২০ অক্টো, ২০২৬

সিলেটে যাওয়ার বিমান, ট্রেন ও বাস, তারপর বিভাগজুড়ে গাড়ি, সিএনজি, নৌকা আর মোটরসাইকেল; সঙ্গে দূরত্ব, আনুমানিক ভাড়া ও যাত্রার সময়।

এই অধ্যায়ে
  1. এক নজরে দূরত্ব
  2. বিমানে
  3. ট্রেনে
  4. বাসে
  5. বিভাগের ভেতরে চলাফেরা
  6. নৌকা ও মোটরসাইকেল
  7. এক নজরে ভাড়া
  8. সিলেট শহর থেকে যাত্রার সময়
  9. নিজে গাড়ি চালালে
  10. ছুটির দিনে ভ্রমণ

সিলেট শহর ঢাকার উত্তর-পূর্বে, সড়কপথে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে, ছোট পরিসরের একটি বিভাগের কেন্দ্রে। সিলেট জেলা উত্তর-পূর্বে জাফলংয়ের পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ আর হাওর, দক্ষিণে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের চা-অঞ্চল। বিমান, ট্রেন বা সড়কপথে এখানে আসা সহজ; ঘোরাফেরায় একটু বেশি ভাবতে হয়, কারণ সেরা জায়গাগুলো ছোট রাস্তা, নদী আর হাওরের খালের শেষ মাথায়।

এই অধ্যায় ছোট গাইড ঢাকা থেকে সিলেট যাবেন কীভাবে-এর চেয়ে বিস্তারিত। ভাড়া আর সময়সূচি ঘন ঘন বদলায়, তাই এখানকার প্রতিটি সংখ্যাকে উল্লিখিত তারিখের আনুমানিক হিসাব হিসেবে ধরুন, আর যাত্রার আগে মিলিয়ে নিন। আবহাওয়া, টাকা-পয়সা আর নিরাপত্তার জন্য দেখুন প্রয়োজনীয় তথ্য।

এক নজরে দূরত্ব

বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থান সিলেট শহর, শ্রীমঙ্গল বা সুনামগঞ্জ থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে, তবে দূরত্বের চেয়ে প্রায়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার অবস্থা, নদী পারাপার আর শেষ অংশটুকু নৌকায় বা পায়ে হাঁটা।

সে হিসাবে মৌলভীবাজার হয়ে সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গল সড়কপথে প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সড়ক যোগাযোগের মেরুদণ্ড এন২, অর্থাৎ ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক, যা ঢাকার প্রান্তে কাঁচপুর থেকে ভৈরব, শায়েস্তাগঞ্জ ও শেরপুর হয়ে সিলেটে পৌঁছে সুরমা পার হয়ে সীমান্তের তামাবিলে শেষ হয়েছে, মোট প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার। তামাবিলে একটি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টও আছে, যেখান দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকিতে যাওয়া যায়। লাগবে পাসপোর্ট আর ডাউকি দিয়ে প্রবেশের উপযোগী ভারতীয় ভিসা; ২০২৬ সালের অক্টোবরে ভারতের ই-ভিসা ওয়েবসাইটে স্থলপথে প্রবেশের জায়গার তালিকায় ডাউকির নাম ছিল, তবে নিয়ম আর খোলা থাকার সময় বদলায়, আর আগেও হঠাৎ এই পথ বন্ধ হয়েছে, যেমন ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মেঘালয়ে অস্থিরতার সময়; তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নিন।

বিমানে

ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (কোড ZYL) সিলেট শহরের উত্তর প্রান্তে, কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের পথ; বিমানবন্দর সড়ক গেছে মালনীছড়া চা-বাগানের পাশ দিয়ে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের সূচিতে ঢাকা রুটে চারটি এয়ারলাইন ছিল: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা। ফ্লাইটে এক ঘণ্টারও কম লাগে, তাই অল্প দিনের ছুটিতে এটাই সেরা। বিমান সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও ফ্লাইট চালিয়েছে, যদিও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কক্সবাজার ফ্লাইট স্থগিত ছিল। চাহিদা অনুযায়ী ভাড়া ওঠানামা করে, তাই ঈদ, ডিসেম্বর আর লম্বা ছুটির জন্য আগেভাগে টিকিট কাটুন।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট

২০২৬ সালে ওসমানী থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালায় শুধু বিমান। সিলেট থেকে লন্ডন হিথরো ও ম্যানচেস্টারের ফ্লাইটে বহু সিলেটি প্রবাসী যাতায়াত করেন; এগুলো ঢাকা পর্যন্ত বা ঢাকা থেকে চলে, তাই উড়োজাহাজ না বদলেই সিলেট আর ব্রিটেনের মধ্যে যাওয়া-আসা যায়। উড়োজাহাজের সংকট আর হজ মৌসুমের কারণে বলে জানা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতে বিমান ম্যানচেস্টার ফ্লাইট স্থগিত করে, আবার চালু করে ৫ জুলাই ২০২৬। বিমান সিলেট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জেদ্দা, মদিনা, শারজাহ, দুবাই ও দোহাতেও ফ্লাইট চালিয়েছে; কোন রুট চালু থাকবে তা মৌসুমভেদে বদলায়, তাই বিমানের হালনাগাদ সূচি দেখুন। অন্য বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক যাত্রী ঢাকায় নেমে সংযোগ ফ্লাইট নেন।

বিমানবন্দর থেকে

আগমন টার্মিনালের বাইরে সিএনজি অটোরিকশা আর ভাড়ার গাড়ি অপেক্ষা করে, আর ৮ জুলাই ২০২৬ থেকে উবার সিলেটে তাদের নিয়মিত রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করেছে; এর আগে সেখানে শুধু মোটরসাইকেল রাইড আর রেন্টাল ছিল। ব্যাগ তোলার আগেই সিএনজির ভাড়া ঠিক করুন। নতুন টার্মিনাল, কার্গো ভবন ও কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণাধীন, শেষ করার লক্ষ্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বর, তাই প্রবেশপথে নির্মাণকাজ চোখে পড়বে।

২০২৬ সালে ওসমানী থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালানো একমাত্র সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস; এর ফ্লাইটে উড়োজাহাজ না বদলেই সিলেট থেকে লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে যাওয়া যায়।
২০২৬ সালে ওসমানী থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালানো একমাত্র সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস; এর ফ্লাইটে উড়োজাহাজ না বদলেই সিলেট থেকে লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে যাওয়া যায়। ছবি: CAPTAIN RAJU, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

ট্রেনে

ট্রেনে আসা সবচেয়ে আরামের, আর চা-অঞ্চলে যাওয়ার সহজতম উপায়ও, কারণ ঢাকা–সিলেট রেলপথ সোজা শ্রীমঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেছে। রেলপথটি ৩১৯ কিলোমিটার, আর সূচি অনুযায়ী ঢাকার কমলাপুর থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে লাগে প্রায় পৌনে সাত থেকে সাত ঘণ্টা। ট্রেনভেদে থামে ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন, ভৈরব বাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমপুর, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ, শমশেরনগর, কুলাউড়া ও মাইজগাঁওয়ে।

বেশির ভাগ আন্তঃনগর ট্রেনের সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকে, আর নতুন সময়সূচিতে ছাড়ার সময় বদলায়, তাই কোনো ট্রেন ধরে পরিকল্পনার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট বা রেল সেবা অ্যাপে হালনাগাদ সূচি দেখে নিন। সাম্প্রতিক সূচিতে দেখা গেছে, পারাবত ঢাকা ছাড়ে খুব সকালে আর সিলেট ছাড়ে বিকেলে, কালনী ঢাকা ছাড়ে বিকেলে আর সিলেট ছাড়ে ভোরে, আর উপবন চলে রাতে।

কোন স্টেশনে নামবেন

  • শ্রীমঙ্গল: চা-বাগান, লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক আর বাইক্কা বিলের জন্য (বাইক্কা বিল আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ, তাই আগে খোঁজ নিন); লাউয়াছড়া প্রায় ৮ কিলোমিটার, সিএনজিতে মিনিট বিশেকের পথ।
  • ভানুগাছ: কমলগঞ্জের স্টেশন, মাধবপুর লেক আর হামহামের ট্রেকিংয়ের পথে।
  • কুলাউড়া: মাধবকুণ্ড আর হাকালুকি হাওরের জন্য জংশন, সেখান থেকে সিএনজিতে।
  • শায়েস্তাগঞ্জ: হবিগঞ্জ শহরের জন্য, আর চুনারুঘাট হয়ে সড়কপথে সাতছড়ির জন্য।
  • সিলেট: শহর আর উত্তর ও পশ্চিমের সব জায়গার জন্য।

ভাড়া ও টিকিট

সেতুর মাশুল যোগ করে ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে পূর্বাঞ্চলের রুটে রেলভাড়া বেড়েছে। ঢাকা–সিলেটে এখন শোভন চেয়ার ৪১০ টাকা, স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) ৭৮৮ টাকা, এসি সিট ৯৪৩ টাকা আর এসি বার্থ ১,৪৬৫ টাকা। চট্টগ্রাম–সিলেটে একই শ্রেণিগুলোর ভাড়া ৪৭৫, ৯০৯, ১,০৮৭ ও ১,৬৭৮ টাকা। ঢাকা–সিলেটে মেইল ও কমিউটার ট্রেনের ভাড়া ১৪০ ও ১৭০ টাকা, তবে এগুলো অনেক ধীরগতির।

টিকিট বিক্রি হয় মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিট ওয়েবসাইট ও রেল সেবা অ্যাপে। আগে নিবন্ধন করুন: বাংলাদেশিরা জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্ট যাচাই করেন, আর বিদেশিরা পাসপোর্ট নম্বর ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে নিবন্ধন করেন। এক দফায় সর্বোচ্চ চারজনের টিকিট কাটা যায়, প্রত্যেকের নাম ও পরিচয়পত্রসহ, আর যাত্রায় টিকিটের সঙ্গে মেলে এমন পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হয়। ২০২৩ সাল থেকে যাত্রার ১০ দিন আগে বিক্রি শুরু হয়, আর ঈদে রেলওয়ে আন্তঃনগরের সব আসন অনলাইনে বিক্রি করেছে, প্রতিটি যাত্রার দিনের টিকিট আলাদা দিনে ছেড়ে।

প্রথমবার এলে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যান, চা-অঞ্চলে এক-দুই রাত থাকুন, তারপর সড়কপথে সিলেটে যান। এতে একই পথে উল্টো ফিরতে হয় না, আর রেলপথের শেষ অংশের অনেকটা গেছে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে।

শ্রীমঙ্গলে ঢুকছে কালনী এক্সপ্রেস। ঢাকা–সিলেট রেলপথের আন্তঃনগর ট্রেন এখানে থামে; শহরের আশপাশের চা-বাগান আর লাউয়াছড়ায় যেতে সাধারণত এই স্টেশনেই নামতে হয়।
শ্রীমঙ্গলে ঢুকছে কালনী এক্সপ্রেস। ঢাকা–সিলেট রেলপথের আন্তঃনগর ট্রেন এখানে থামে; শহরের আশপাশের চা-বাগান আর লাউয়াছড়ায় যেতে সাধারণত এই স্টেশনেই নামতে হয়। ছবি: Ifthekhar Omer, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

বাসে

ঢাকা–সিলেট রুটে দিনরাত কোচ চলে। বেশির ভাগ ছাড়ে ঢাকার সায়েদাবাদ টার্মিনাল বা তার কাছের কোম্পানি কাউন্টার থেকে, কিছু শহরের অন্য জায়গা থেকেও যাত্রী তোলে। স্বাভাবিক যানজটে লাগে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা, ছুটির আগের দিন আরও বেশি।

মোটামুটি তিন ধরনের বাস। বড় জাতীয় কোম্পানিগুলোর বিলাসবহুল এসি কোচে হেলানো আসন, থামে কম। সাধারণ নন-এসি কোচ সস্তা ও ধীরগতির। লোকাল বাস যেখানে-সেখানে থামে আর সিলেটকে জেলা শহর ও উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করে; ছোট দূরত্বের জন্যই এগুলো ভালো।

নন-এসি বাসের ভাড়া দূরত্ব ধরে সরকার নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের তালিকায় সায়েদাবাদ থেকে সিলেটের দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার, ভাড়া ৫১ আসনের বাসে ৫৮০ টাকা আর ৪০ আসনের বাসে ৭৪০ টাকা। এসি বাসের ভাড়া সরকার নয়, কোম্পানিগুলো ঠিক করে, আর তা বেশি। প্রতি ঈদের আগে ভাড়া লাফিয়ে বাড়ে: ২০২৬ সালের মার্চে ঢাকা থেকে উত্তরের জেলাগুলোর রুটে যাত্রীরা জানান, নন-এসি ভাড়া ৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে আর এসি ভাড়া রাতারাতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

সিলেটে কোচগুলো পৌঁছায় কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বা তার কাছে; পুরোনো কোম্পানি কাউন্টারগুলো কদমতলী থেকে হুমায়ুন রশীদ চত্বর পর্যন্ত রাস্তার পাশে। ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া টার্মিনাল ভবনটি ২০২৫ সালের অক্টোবরেই জীর্ণ দশায় ছিল, তবে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার আর সিলেটের উপজেলাগুলোর লোকাল বাস এর ভেতর থেকেই ছাড়ে।

মহাসড়ক

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক এখনো বেশির ভাগ জায়গায় দুই লেনের, আর ভারী ট্রাক চলে। সাসেক ঢাকা–সিলেট করিডর প্রকল্পে একে ছয় লেনে উন্নীত করার লক্ষ্য জুন ২০২৯; ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১৩টি নির্মাণ প্যাকেজের ৮টি ঠিকমতো এগোচ্ছিল আর ৫টি পিছিয়ে ছিল, আর কাঁচপুর থেকে হবিগঞ্জের মধ্যে বিভিন্ন অংশে কাজ চলছে। সিলেট থেকে তামাবিলের ৫৬ কিলোমিটার চওড়া করার আলাদা প্রকল্প ২০২০ সালে অনুমোদন পেলেও জমি অধিগ্রহণ আর ঠিকাদার নিয়োগে দেরির কারণে পিছিয়ে পড়েছে।

সুরমার ওপর কিন ব্রিজ সিলেট শহরের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি, আর পৌঁছে দিক ঠিক করে নেওয়ার সহজ জায়গা।
সুরমার ওপর কিন ব্রিজ সিলেট শহরের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি, আর পৌঁছে দিক ঠিক করে নেওয়ার সহজ জায়গা। ছবি: CAPTAIN RAJU, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

বিভাগের ভেতরে চলাফেরা

বিভাগের ভেতরে সড়কপথের সঙ্গে মেলাতে হয় নৌকা, কোথাও কোথাও মোটরসাইকেল। একটি নিয়মে বেশির ভাগ পর্যটকের সময় ও টাকা দুটোই বাঁচে: পুরো দিনের ঘোরাঘুরিতে প্রতি জায়গায় যানবাহন না বদলে চালকসহ একটি গাড়ি ভাড়া নিন।

চালকসহ গাড়ি

সিলেট শহর ও শ্রীমঙ্গলে হোটেল, ট্রাভেল এজেন্ট আর রেন্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে চালকসহ কার বা মাইক্রোবাস দিন হিসেবে ভাড়া নেওয়া যায়, আর সিলেটে উবার রেন্টালসও চালু আছে। স্থানীয় চালক ঘাট আর পার্কিংয়ের জায়গা চেনেন, আর আপনি নৌকায় ঘুরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। রওনার আগে পথ, সময়, জ্বালানি-টোল-পার্কিং ভাড়ার মধ্যে কি না, আর চালকের খাবারের ব্যবস্থা ঠিক করে নিন। ছুটির দিনে ভাড়া বেশি।

সিএনজি অটোরিকশা

সবুজ রঙের তিন চাকার সিএনজিই বিভাগের প্রধান বাহন। শহরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়; গ্রামাঞ্চলে আধা বা পুরো দিনের জন্য ভাড়া নেওয়া যায়, আর শ্রীমঙ্গলে লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক ও বাইক্কা বিলে যাওয়ার প্রচলিত উপায় এটিই। সিএনজি মিটারে চলে না, তাই আগে ভাড়া ঠিক করুন, আর মনে রাখবেন, এর খোলা পাশ মহাসড়কে খুব কম সুরক্ষা দেয়।

লোকাল বাস, লেগুনা ও রিকশা

সিলেট থেকে জাফলং, সুনামগঞ্জ আর জেলা শহরগুলোতে লোকাল বাস চলে; জাফলংয়ের বাস ছাড়ে কদমতলী ও শিবগঞ্জ থেকে। ভাড়া কম, তবে ভিড় বেশি আর ব্যাগ রাখার জায়গা কম। কিছু গ্রামীণ সড়কে ফাঁক পূরণ করে লেগুনা, বেঞ্চ বসানো ছোট রূপান্তরিত পিকআপ। সিলেট শহরে সাইকেল রিকশা সর্বত্র, পুরোনো শহরের অল্প দূরত্বে এটাই আরামের বাহন।

রাইড শেয়ারিং

সিলেটে এতদিন শুধু মোটরসাইকেল রাইড ও রেন্টাল দেওয়া উবার ৮ জুলাই ২০২৬ থেকে শহরে নিয়মিত রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করেছে। শহরের ভেতরে আর বিমানবন্দরে যাতায়াতে রাইড শেয়ারিং কাজে আসে; দিনের ভ্রমণে ঘাট চেনেন এমন চালকসহ ভাড়া গাড়িই এখনো ভালো।

সবুজ সিএনজি অটোরিকশাই বিভাগের নিত্যদিনের প্রধান বাহন; মিটার নেই, তাই ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করুন।
সবুজ সিএনজি অটোরিকশাই বিভাগের নিত্যদিনের প্রধান বাহন; মিটার নেই, তাই ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করুন। ছবি: Md.Mijanur rahman Mijan, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

নৌকা ও মোটরসাইকেল

সিলেটের সেরা অনেক জায়গায় পৌঁছাতে হয়, বা দেখার মানেই হয়, নৌকায়। নৌকা ভাড়া হয় আসন নয়, পুরো নৌকা হিসেবে, সংশ্লিষ্ট জায়গার সবচেয়ে কাছের ঘাট থেকে; ব্যস্ত জায়গায় অনেক সময় কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ায় নৌকা চলে।

  • রাতারগুল: চার-পাঁচজনের ছোট নৌকায় ডুবন্ত বনের ভেতর প্রায় এক ঘণ্টা, মোটরঘাট বা চৌধুরী বাজার থেকে।
  • সাদা পাথর: ভোলাগঞ্জের ঘাট থেকে নির্ধারিত আসা-যাওয়ার ভাড়ায় ১৫ মিনিটের নৌযাত্রা।
  • বিছনাকান্দি ও পান্থুমাই: হাদারপার বাজার থেকে নৌকায় প্রায় ৪০ মিনিট; মাঝিকে দুটোই রাখতে বলুন।
  • লালাখাল: সারিঘাট সেতু হয়ে পৌঁছে সারি নদীতে ইঞ্জিন নৌকায় দুই থেকে তিন ঘণ্টার আসা-যাওয়া।
  • জাফলং: নদী পার হয়ে খাসিয়া গ্রামের দিকে ছোট পারাপার।
  • টাঙ্গুয়ার হাওর: ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান নিষিদ্ধ; কোন নিবন্ধিত নৌকা কোথায় চলতে পারে, তাহিরপুর বা সুনামগঞ্জ শহরে জেনে নিন।

টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউসবোট আগেই বুক করতে হয়, সাধারণত নৌকার সোশ্যাল মিডিয়া পেজে দেওয়া নম্বরে ফোন করে। ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে হাউসবোট চালাতে জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে আর হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) ঢোকা নিষেধ, যদিও খবর অনুযায়ী এর বাইরে আর টেকেরঘাট পর্যন্ত নৌকা চলতে পারে; কোন পথে যাওয়ার অনুমতি আছে, অপারেটরের কাছে জেনে নিন। নিষেধাজ্ঞার আগে, ২০২৪ সালের জুনে খাবারসহ দুই দিন এক রাতের প্যাকেজ জনপ্রতি মোটামুটি ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা ছিল, সাপ্তাহিক ছুটি আর পূর্ণিমার সময় বেশি। হাওরে ঢোকার পথ ছোট বলে তাহিরপুর থেকে নৌকা সস্তা, তবে বর্ষায় উঁচু পানিতে সুনামগঞ্জ–তাহিরপুর সড়ক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যেখানে সাধারণত প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগে। কী কী জিজ্ঞেস করবেন, তা আছে আমাদের হাউসবোট গাইডে।

তাহিরপুরে মোটরসাইকেল

তাহিরপুরের আশপাশে টেকেরঘাট, নীলাদ্রি লেক, বারিক্কা টিলা আর শিমুল বাগানে যাওয়ার প্রচলিত উপায় ভাড়ার মোটরসাইকেল, পথে যাদুকাটা পার হতে হয়। চালকের সঙ্গে পুরো পথ আর অপেক্ষার সময় ঠিক করে নিন, হেলমেট চেয়ে নিন, আর অন্ধকারে সীমান্তের ভাঙা রাস্তায় চলা এড়িয়ে চলুন।

বর্ষায় রাতারগুলে চার-পাঁচজনের ছোট নৌকা ডুবন্ত গাছের ফাঁক দিয়ে চলে, পুরো নৌকা ভাড়া হয় প্রায় এক ঘণ্টার জন্য।
বর্ষায় রাতারগুলে চার-পাঁচজনের ছোট নৌকা ডুবন্ত গাছের ফাঁক দিয়ে চলে, পুরো নৌকা ভাড়া হয় প্রায় এক ঘণ্টার জন্য। ছবি: Sumon Mallick, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

এক নজরে ভাড়া

জ্বালানির দাম, মৌসুম আর ছুটির সঙ্গে ভাড়া ওঠানামা করে। নিচের সংখ্যাগুলো আমাদের পাওয়া সর্বশেষ তথ্য, তারিখসহ; এগুলো দিয়ে প্রস্তাবিত ভাড়া যাচাই করুন, নির্ধারিত তালিকা হিসেবে নয়।

সিলেট শহর থেকে যাত্রার সময়

শুকনো আবহাওয়ায়, ছুটির ভিড় ছাড়া গাড়িতে সাধারণত যত সময় লাগে। নৌকা আর হাঁটার সময় আলাদা যোগ করুন, বর্ষায় আরও বেশি।

উত্তরের যেকোনো জায়গায় যেতে সকাল ৮টার মধ্যে রওনা দিন। তামাবিলে ছুটির দিনের যানজট এড়ানো যায়, নদীতে সবচেয়ে পরিষ্কার আলো পাওয়া যায়, আর অন্ধকারের আগেই শহরে ফেরা যায়।

নিজে গাড়ি চালালে

বাংলাদেশে গাড়ি চলে রাস্তার বাঁ দিক দিয়ে, আর ঢাকা থেকে আসা অনেকেসহ বেশির ভাগ পর্যটক স্থানীয় চালকই পছন্দ করেন। নিজের গাড়ি আনলে এন২ ধরে চলা সহজ, তবে কষ্টসাধ্য: বেশির ভাগ অংশে দুই লেন, একই রাস্তায় দ্রুতগামী কোচ, ধীর ট্রাক, সিএনজি আর সাইকেল, আর ছয় লেনের কাজ চলায় নির্মাণ এলাকা।

সীমান্তের রাস্তায় যাওয়ার আগে জেলা শহরেই জ্বালানি ভরে নিন, রাতে আর বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে গাড়ি চালানো এড়িয়ে চলুন, আর সিলেট–তামাবিল মহাসড়কে পুলিশের চেকপোস্টের জন্য প্রস্তুত থাকুন (জাফলংয়ে কেনা পণ্য নিয়ে দেখুন প্রয়োজনীয় তথ্য)। ছুটির দিনে ব্যস্ত জায়গায় পার্কিং কম, তাই আগে পৌঁছান। চা-বাগানের রাস্তায় ধীরে চালান আর শ্রমিক ও ট্রাক্টরকে পথ ছেড়ে দিন।

ছুটির দিনে ভ্রমণ

শুক্র-শনিবার, আর সবচেয়ে বেশি ঈদের ছুটিতে, যাতায়াতের প্রতিটি ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে চাপ পড়ে। কয়েকটি অভ্যাস কাজে দেয়।

  • বিক্রি শুরুর দিনই, অর্থাৎ ১০ দিন আগে, ট্রেনের টিকিট কাটুন আর আগেভাগে লগ ইন করুন; ঈদে প্রতিটি যাত্রার দিনের আসন আলাদা দিনে বিক্রি হয়।
  • কোচের টিকিট কয়েক দিন আগে কাটুন; রাতের কোচ সবার আগে শেষ হয়।
  • সামর্থ্য থাকলে বিমানে যান, আর যত আগে সম্ভব বুক করুন।
  • সম্ভব হলে ঈদের আগের দিন আর ছুটির শেষ দিন এড়িয়ে চলুন, যখন রাস্তা আর ট্রেনে সবচেয়ে ভিড়।
  • দিনের ভ্রমণ সপ্তাহের অন্য দিনে করুন, অথবা ছুটির দিনে ভোরে বের হোন।
  • গাড়ি আগেই ঠিক করুন; সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে তাৎক্ষণিক ভাড়া বাড়ে আর গাড়ি-নৌকার টান পড়ে।
তাহিরপুরের কাছে যাদুকাটা নদী। বারিক্কা টিলা ও শিমুল বাগান ঘুরতে এই নদী পার হতে হয়; সাধারণত মোটরসাইকেল ভাড়া করে এ পথে যাওয়া হয়।
তাহিরপুরের কাছে যাদুকাটা নদী। বারিক্কা টিলা ও শিমুল বাগান ঘুরতে এই নদী পার হতে হয়; সাধারণত মোটরসাইকেল ভাড়া করে এ পথে যাওয়া হয়। ছবি: AKA Mahmudul, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

তথ্যসূত্র

এই গাইডের তথ্য অক্টোবর ২০২৬-এ নিচের সূত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, তাই খোলার সময়, ভাড়া ও নিয়মকানুন স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

  1. Wikipedia: Osmani International Airport (en.wikipedia.org)
  2. Dhaka Tribune: Bangladeshi expats in UK worried over suspension of Sylhet–Manchester flight (11 January 2026) (dhakatribune.com)
  3. BSS: PM instruction resumes Sylhet-Manchester flights: Afroza (5 July 2026) (bssnews.net)
  4. Wikipedia: Upaban Express (en.wikipedia.org)
  5. Wikipedia: Parabat Express (en.wikipedia.org)
  6. Wikipedia: Kalni Express (en.wikipedia.org)
  7. Wikipedia: Udayan Express (en.wikipedia.org)
  8. The Daily Star Bangla: Eastern railway fares rise on six routes (9 December 2025) (bangla.thedailystar.net)
  9. bdnews24 (Bangla): Train fares rise on six eastern routes from 20 December (9 December 2025) (bangla.bdnews24.com)
  10. Dhaka Tribune: Eid is coming: How to buy advance train tickets online (2 June 2024) (dhakatribune.com)
  11. Daily Observer: Train tickets can be bought 10 days in advance (31 March 2023) (observerbd.com)
  12. Prothom Alo: Bus fares on Dhaka, Chattogram and long-distance routes (25 April 2026) (prothomalo.com)
  13. bdnews24 (Bangla): Eid bus fares rise as advance sales open (3 March 2026) (bangla.bdnews24.com)
  14. The Business Standard (Bangla): Sylhet's bus terminal run-down within three years (26 October 2025) (tbsnews.net)
  15. Wikipedia: N2 (Bangladesh) (en.wikipedia.org)
  16. Wikipedia: List of roads in Bangladesh (en.wikipedia.org)
  17. Dhaka Tribune: Rabiul: Target to complete six-lane Dhaka-Sylhet highway by June 2029 (19 September 2026) (dhakatribune.com)
  18. BSS: Uber launches ridesharing in Sylhet (8 July 2026) (bssnews.net)
  19. Prothom Alo: Five facts about houseboat travel in Tanguar Haor (8 June 2024) (prothomalo.com)
  20. Wikipedia (Bangla): Sreemangal Upazila (bn.wikipedia.org)
  21. Flightsfrom.com: Sylhet to Dhaka direct flights (schedules for October and November 2026) (flightsfrom.com)
  22. Government of India: e-Visa entry and exit points (checked October 2026) (indianvisaonline.gov.in)
  23. The Daily Star: Immigration through Tamabil closed (13 December 2019) (thedailystar.net)
  24. Prothom Alo English: Sunamganj district administration's houseboat directive for Tanguar Haor (3 August 2026) (en.prothomalo.com)

এই গাইডের জায়গাগুলো

শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান
এখন সবচেয়ে সুন্দর
শ্রীমঙ্গল

শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান

ঢেউখেলানো চা-বাগান, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট আর শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত সাত রঙের চা।

জাফলং
জাফলং ও গোয়াইনঘাট

জাফলং

খাসিয়া পাহাড় আর ডাউকি সেতুর নিচে পাথরের বুক বেয়ে বয়ে চলে পিয়াইন নদী।

টাঙ্গুয়ার হাওর
বিধিনিষেধ আছে
সুনামগঞ্জ ও টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওর

মেঘালয় পাহাড়ের নিচে রামসার জলাভূমি, যেখানে আছে জলাবনের গাছ, দ্বীপের মতো গ্রাম আর শীতের জলচর পাখি।

গাইডের আরও অধ্যায়

সিলেট ভ্রমণ গাইড
পড়তে ১৬ মিনিট

সিলেটের ইতিহাস: শ্রীহট্ট থেকে লন্ডনি যুগ

তাম্রশাসন, ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন, ব্রিটিশ আমলের চুনাপাথর ও চা, সিলেটি নাবিক আর ১৯৪৭ সালের গণভোট: অতীত যেভাবে গড়েছে আজকের সিলেট।

পড়তে ১৪ মিনিট

সিলেট বিভাগের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি

সিলেটি ভাষা ও নাগরী লিপি, মরমি গান, মণিপুরি নাচ, খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগানের উৎসব আর লন্ডনি যোগসূত্র, সঙ্গে সম্মান রেখে বেড়ানোর পরামর্শ।