সিলেট বিভাগ কোথায়, এর চার জেলায় কী দেখার আছে, কখন যাবেন, কত দিন থাকবেন, কীভাবে ঘুরবেন আর কীভাবে দায়িত্ব নিয়ে ভ্রমণ করবেন।
এই অধ্যায়ে
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণ জুড়ে সিলেট বিভাগ, এক নিচু অববাহিকা, যার তিন দিকে ভারতের পাহাড়: উত্তরে মেঘালয়, পূর্বে আসাম আর দক্ষিণে ত্রিপুরা। এর টিলাগুলোতে হয় দেশের বেশির ভাগ চা, সীমান্তের নদী পাহাড় ছেড়ে নামে পাথরের বুক বেয়ে, আর বর্ষায় হাওর হয়ে ওঠে বিশাল জলরাশি, যার মাঝে গ্রামগুলো জেগে থাকে দ্বীপের মতো।
শুরু করুন এখান থেকে। এই অধ্যায়ে আছে বিভাগ, তার অতীত আর চার জেলার পরিচয়, ঋতুর হিসাব, তিনটি ভ্রমণপরিকল্পনা আর জরুরি নিয়মকানুনের সারকথা, সঙ্গে বিস্তারিত অধ্যায়গুলোর লিংক।
অল্প কথায় সিলেট
পুরোনো বৃহত্তর সিলেটের চার জেলা নিয়ে ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট বিভাগটি গঠিত হয়। সুরমার উত্তর তীরের সিলেট শহরই এর প্রধান শহর ও প্রবেশদ্বার।
এখানে সবকিছুর নিয়ন্তা পানি। সীমান্তে এসে বরাক দুই ভাগ হয়েছে: উত্তরে সুরমা, যা বয়ে গেছে সিলেট শহর আর সুনামগঞ্জের পাশ দিয়ে, আর দক্ষিণে কুশিয়ারা; ভৈরব বাজারের উজানে দুটি আবার মিলে হয়েছে মেঘনা। দুই নদীর মাঝে হাওর, যা বছরে কয়েক মাস পানিতে ডুবে থাকে, আর কিনারে টিলার সারি, যার গায়ে চা-বাগান আর উত্তর-পূর্বের অবশিষ্ট পাহাড়ি বন।
মানুষ আসেন নানা কারণে: জিয়ারতকারীরা হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে, পরিবার আর তরুণেরা জাফলং ও লালাখালের সীমান্ত-নদী আর রাতারগুলের ডুবন্ত বনে, কেউ শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, লাউয়াছড়ার উল্লুক বা হাওরের টানে। আর যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশিদের বেশির ভাগের শিকড় এই অঞ্চলেই, তাই অনেক পর্যটকের কাছে এ যাত্রা আসলে ঘরে ফেরা।

সংক্ষেপে সিলেটের অতীত
তাম্রশাসন, অর্থাৎ তামার পাতে খোদাই করা ভূমিদানপত্র জানায়, তখনকার শ্রীহট্ট নামের এই সমভূমি পর্যায়ক্রমে শাসিত হয়েছে আজকের আসামের কামরূপ থেকে, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার চন্দ্র রাজাদের হাতে আর স্থানীয় রাজবংশের অধীনে। উত্তরে জৈন্তাপুর থেকে রাজত্ব করতেন জৈন্তিয়া রাজারা, ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশরা তাঁদের রাজ্য দখল করা পর্যন্ত।
১৩০৩ সালে বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের বাহিনী গৌড়ের শেষ রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে। প্রচলিত বিশ্বাস, সুফি সাধক শাহজালাল (রহ.) সঙ্গীদের নিয়ে এই অভিযানে যোগ দেন; ঐতিহ্য অনুযায়ী সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০। তিনি এখানেই থেকে যান, ১৩৪৫ বা ১৩৪৬ সালে ইবনে বতুতা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আর তখন থেকে তাঁর মাজারে জিয়ারতকারীদের আসা থামেনি। এ কারণেই সিলেটকে প্রায়ই বলা হয় বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী।
১৬১২ সালে মোগল শাসন পাকাপোক্ত হয়, আর ১৭৬৫ সালে শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ১৮৫৪ সালে মালনীছড়ায় চা চাষ শুরু হয় (অন্য কিছু বিবরণে ১৮৪৯), শ্রমিক আনা হয় ভারতের নানা অঞ্চল থেকে; আর ১৮৭৪ সালে সিলেটকে বাংলা থেকে সরিয়ে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এদিকে সিলেটের তরুণেরা ব্রিটিশ জাহাজে কাজ নিয়ে সাগরে পাড়ি দেন; সেখান থেকেই শুরু ব্রিটেনের সঙ্গে বন্ধনের।
আসামের অংশ হিসেবে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সিলেটে আলাদা গণভোট হয়, আর সিলেট পূর্ব বাংলার সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে রায় দেয়, যদিও করিমগঞ্জ মহকুমার বেশির ভাগ চলে যায় ভারতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী ছিলেন সিলেটের মানুষ, আর ৭ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের সিলেট যুদ্ধের পর শহর মুক্ত হয়। পুরো কাহিনি পড়ুন সিলেটের ইতিহাস অধ্যায়ে।

চার জেলা
প্রতিটি জেলার নিজস্ব চরিত্র আছে, আর এই গাইডে আছে প্রতিটির আলাদা অধ্যায়। জনসংখ্যা ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী।
সিলেট: শহর আর উত্তরের সীমান্ত
সবচেয়ে জনবহুল সিলেট জেলায় প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের বাস; এর মধ্যে পড়েছে শহর আর উত্তরের সীমান্ত। শহরে আছে দুই প্রধান মাজার, শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার আর টিলার ওপর শাহপরান (রহ.)-এর মাজার, সুরমার ওপর কিন ব্রিজ, আর চালু চা-বাগান মালনীছড়া, যার যাত্রা বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ১৮৫৪ সালে, অন্য কিছু বিবরণে ১৮৪৯ সালে। দেখুন সিলেট শহর।
উত্তরে ধানখেত থেকে প্রায় সোজা উঠে গেছে মেঘালয়ের পাহাড়, আর সীমান্তের উপজেলাগুলোতে আছে সেই নদী আর বন, যার টানে বেশির ভাগ পর্যটক আসেন। শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে লালাখালে নীলচে-সবুজ সারি নদী ধরে উজানে যায় নৌকা; একই পথে জৈন্তাপুরের মেগালিথ; আর প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের জাফলং, বিভাগের সবচেয়ে বেশি পর্যটক টানা জায়গাগুলোর একটি, পাহাড়ের নিচে পাথরের বুকে ছড়িয়ে আছে; ছুটির দিনে সেখানে ভিড় হয় অনেক বেশি। রাতারগুলে ডুবে থাকা গাছের ফাঁকে চলে ছোট নৌকা, আর বর্ষায় বিছনাকান্দি ভরে ওঠে পাহাড়ের ঠান্ডা স্বচ্ছ পানিতে। দেখুন জাফলং, বিছনাকান্দি আর উত্তরের পাহাড়।

মৌলভীবাজার: চা-বাগান, বন আর জলপ্রপাত
সিলেটের দক্ষিণে জমি ভাঁজ খেয়ে উঠেছে চা-গাছে ছাঁটা সবুজ টিলায়। প্রায় ২১ লাখ মানুষের মৌলভীবাজার জেলায় দেশের প্রায় ৯০টি চা-বাগান, আর সাধারণত যে হিসাব দেওয়া হয় (২০২৩ সালেও তা প্রকাশিত হয়েছে), তাতে দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ চা হয় এখানেই; শ্রীমঙ্গলকে সাধারণত বলা হয় বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী।
বাগানের ফাঁকে ফাঁকে বন আর পানি। শ্রীমঙ্গল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বিভাগের পাহাড়ি বনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত; এর খ্যাতি উল্লুকের জন্য, সকালে যাদের জোরালো ডাক বনজুড়ে শোনা যায়। বড়লেখায় মাধবকুণ্ড প্রচলিত হিসাবে প্রায় ৫০ মিটার উঁচু থেকে আছড়ে পড়ে কুণ্ডে, আর দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমিগুলোর একটি হাকালুকি হাওর শীতে ভরে যায় পরিযায়ী পাখিতে। কমলগঞ্জে মণিপুরিদের রাসলীলা চলে পূর্ণিমার সারা রাত; এই পূর্ণিমা সাধারণত পড়ে নভেম্বরে। দেখুন শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার এবং সিলেটের চা-বাগান।
সুনামগঞ্জ: হাওর আর লোককবিদের দেশ
পশ্চিমের সুনামগঞ্জ, জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ, পুরোপুরি হাওরের দেশ: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পুরো জেলাই হাওরাঞ্চল, আর বর্ষায় হাওর ৬ মিটার পর্যন্ত গভীর হয়, গ্রামগুলো দাঁড়িয়ে থাকে দ্বীপের মতো। জেলার সবচেয়ে পরিচিত জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর ১৯৯৯ সাল থেকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা আর ২০০০ সালের ১০ জুলাই থেকে রামসার সাইট; ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে ওই সংকটাপন্ন এলাকায় হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান নিষিদ্ধ (বিস্তারিত নিচে)।
তাহিরপুর থেকে সীমান্ত ধরে পথ গেছে টেকেরঘাটের পুরোনো চুনাপাথর খনির নীল পানির নীলাদ্রি লেকে, যাদুকাটা নদীর ওপরের বারিক্কা টিলায়, আর নদী পেরিয়ে, মোটামুটি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে লাল শিমুল ফুলে ছাওয়া শিমুল বাগানে। সুনামগঞ্জ লোককবি হাছন রাজা আর শাহ আবদুল করিমেরও দেশ। দেখুন সুনামগঞ্জ ও হাওর।

হবিগঞ্জ: চা-বাগান, হাওর আর মহাসড়কের পাশের বন
প্রায় ২৪ লাখ মানুষের হবিগঞ্জ ঢাকা থেকে আসার প্রধান সড়ক ও রেলপথের ওপর, যা গেছে হবিগঞ্জ শহরের রেলস্টেশন শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে। চা উৎপাদনে সাধারণত মৌলভীবাজারের পরেই এর স্থান ধরা হয়, নিচু জমির বড় অংশই হাওর, আর চুনারুঘাটের মুড়ারবন্দে আছে সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের মাজার; প্রচলিত কাহিনিতে তরফ বিজয়ের সঙ্গে তাঁর নামই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে।
চুনারুঘাটে পুরোনো ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সড়কভ্রমণে সহজ বিরতি: ছোট, মাঝারি ও লম্বা চিহ্নিত হাঁটার পথ, গাছের মাথা ছাড়িয়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, আর গাছে উল্লুক, হনুমান ও ধনেশ পাখি। আয়তনে বড় আর আরও বুনো রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য লাউয়াছড়ার চেয়ে অনেক নিরিবিলি। দেখুন হবিগঞ্জ।
কখন যাবেন
সিলেট শহরে বছরে প্রায় ৪,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, প্রায় সবটাই এপ্রিল থেকে অক্টোবরে, আর অনেক জায়গার আসল রূপ কেবল এক মৌসুমেই। তারিখ ঠিক করার আগে ভেবে নিন সবচেয়ে বেশি কী দেখতে চান।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুকনো মৌসুমে ভ্রমণ সবচেয়ে সহজ: দিনে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ডিসেম্বর-জানুয়ারির রাতে ১০ থেকে ১২ ডিগ্রির কাছাকাছি, বনের পথ শুকনো, নদী অগভীর ও স্বচ্ছ, আর হাওরে পরিযায়ী পাখির ভিড়।
মার্চ থেকে গরম বাড়ে, শুরু হয় দিনের শেষ ভাগের ঝড়বৃষ্টি। চা-পাতা তোলা শুরু হয়, এপ্রিল-মে মাসে হাওরের কৃষকেরা বোরো ধান ঘরে তুলতে ছোটেন, আর মে মাস নাগাদ পাহাড়ের কাছে আকস্মিক ঢলের আশঙ্কা থাকে।
জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষায় শুধু জুনেই প্রায় ৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, তবে তখনই রাতারগুল দাঁড়িয়ে থাকে পানিতে, পাহাড়ি ছড়া আর ঝরনা ভরে ওঠে, আর হাওর হয়ে যায় যেন সাগর। পাহাড়ে বৃষ্টির পর কয়েক ঘণ্টায় নদী ফুলে উঠতে পারে, আর ২০২২ সালের জুনে বন্যায় সিলেটে বিমান ও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; তাই পরিকল্পনায় নমনীয়তা রাখুন। অক্টোবরে বৃষ্টি কমে, আকাশ পরিষ্কার হয়, হাওরও তখনো ভরা; তাই প্রথমবার ঘুরতে আসার জন্য এটি সেরা মাসগুলোর একটি।
- লালাখাল ও জাফলং: স্বচ্ছ পানির জন্য নভেম্বর থেকে মার্চ।
- জৈন্তাপুর, লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি: অক্টোবর থেকে মার্চ, যখন পথ শুকনো।
- রাতারগুল ও মাধবকুণ্ড: জুন থেকে সেপ্টেম্বর।
- বিছনাকান্দি ও সাদা পাথর: জুন থেকে অক্টোবর; পান্থুমাই ও হামহাম: জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর।
- হাকালুকি হাওর: পাখির জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, খোলা পানির জন্য জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর।
- চা-বাগান: পাতা তোলার মৌসুম মার্চ থেকে নভেম্বর; বর্ষায় ঢালগুলো সবচেয়ে সবুজ।
- শিমুল বাগান: ফাল্গুন-চৈত্র, অর্থাৎ মোটামুটি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে, যখন গাছে ফুল ফোটে।
যে মৌসুমেই যান, পারলে শুক্রবার আর ঈদের ছুটি এড়িয়ে চলুন। আরও দেখুন কখন যাবেন, বর্ষায় সিলেট আর শীতে সিলেট।

কত দিন থাকবেন: তিনটি ভ্রমণপরিকল্পনা
দূরত্ব কম মনে হলেও ঘাট, নৌকা আর সরু রাস্তায় সময় লাগে। প্রতি রাতে জায়গা বদলানোর চেয়ে এক বা দুটি ঘাঁটিতে থেকে দিনভ্রমণে বের হোন।
সপ্তাহান্তে: সিলেট শহর আর উত্তরাঞ্চল
বিমানে আসুন, অথবা ঢাকা থেকে রাতের উপবন এক্সপ্রেসে। প্রথম দিন: সকাল সকাল শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার, তারপর মালনীছড়ার বাগানের পথ, আর সূর্যাস্তে কিন ব্রিজ। দ্বিতীয় দিন, শুকনো মৌসুমে: সকাল ৮টার মধ্যে বেরিয়ে শাহপরান (রহ.)-এর মাজার, লালাখাল, জৈন্তাপুর আর জাফলং। বর্ষায় এর বদলে ভোরে রাতারগুলে নৌকায় ঘুরে চলে যান বিছনাকান্দি। দেখুন সিলেটে দুই দিন।
পাঁচ দিন: উত্তরাঞ্চল আর চা-অঞ্চল
- প্রথম দিন: সপ্তাহান্তের পরিকল্পনার মতো সিলেট শহর।
- দ্বিতীয় দিন: তামাবিল সড়ক ধরে জাফলং; বর্ষায় লালাখাল বাদ দিয়ে জাফলংয়ে বেশি সময় কাটান।
- তৃতীয় দিন: বর্ষায় রাতারগুল, তারপর হাদারপার থেকে নৌকায় বিছনাকান্দি ও পান্থুমাই; শুকনো মৌসুমে এমসি কলেজ, টিলাগড় ইকোপার্ক আর লাক্কাতুরা চা-বাগান।
- চতুর্থ দিন: প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়িতে শ্রীমঙ্গল, বিকেলটা চা-বাগানে, শেষে এক গ্লাস সাত রঙের চা।
- পঞ্চম দিন: সকাল সকাল লাউয়াছড়া আর মাধবপুর লেক, তারপর ট্রেনে ঢাকা; ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৫ ঘণ্টা লাগে, তবে চলতি সময়সূচি দেখে নিন।
দশ দিন: চার জেলাই
- প্রথম থেকে তৃতীয় দিন: পাঁচ দিনের পরিকল্পনার মতো; সাদা পাথর যোগ করার আগে সেখানকার অবস্থা জেনে নিন।
- চতুর্থ দিন: প্রায় ২ ঘণ্টা গাড়িতে সুনামগঞ্জ, তেঘরিয়ায় হাছন রাজার বাড়ি দেখে রাতে শহরে থাকুন।
- পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিন: ভাড়ার মোটরসাইকেলে তাহিরপুর হয়ে বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান আর নীলাদ্রি লেক, অন্ধকারের আগে ফেরা; নৌকায় উঠুন কেবল জেলা প্রশাসনের অনুমোদিত পথে।
- সপ্তম দিন: সিলেট হয়ে শ্রীমঙ্গল।
- অষ্টম দিন: লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক আর কমলগঞ্জের কোনো মণিপুরি গ্রাম।
- নবম দিন: বর্ষায় গাইডের সঙ্গে হামহাম ট্রেক, শীতে হাকালুকি হাওর বা মাধবকুণ্ড।
- দশম দিন: সকাল সকাল সাতছড়ি, তারপর সড়কপথে, অথবা শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ট্রেনে ঢাকা।
উত্তরের দিনভ্রমণে সারা দিনের জন্য চালকসহ একটি গাড়ি নিন, অপেক্ষার সময়সহ পুরো ভাড়া আগে ঠিক করুন, আর তামাবিলের ছুটির দিনের যানজট এড়াতে সকাল ৮টার মধ্যে রওনা দিন।
যাতায়াত
২০২৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা আর ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে চারটি এয়ারলাইনের ফ্লাইট ছিল, যাত্রায় এক ঘণ্টাও লাগে না। ২০২৬ সালের হিসাবে সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালায় কেবল বিমান বাংলাদেশ; লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের ফ্লাইটগুলো ঢাকা থেকে আসে বা ঢাকায় যায়, তাই সিলেট আর ব্রিটেনের মধ্যে বিমান বদলাতে হয় না। ৩১৯ কিলোমিটারের রেলপথে আন্তনগর ট্রেনের সময়সূচিতে লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট থেকে ৭ ঘণ্টা, পথে শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়ার মতো স্টেশনে থামে, আর রাতের উপবন এক্সপ্রেসে আছে এসি বার্থ। স্বাভাবিক অবস্থায় ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে কোচে লাগে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা, ছুটির আগে আরও বেশি।
বিভাগের ভেতরে দিনভিত্তিক চালকসহ গাড়ি নিন, অথবা মিটারবিহীন সিএনজি অটোরিকশা আর লোকাল বাসে চলুন। অনেক জায়গায় পথ শেষ হয় ঘাটে, যেখানে পুরো নৌকা ভাড়া নিতে হয়, আর তাহিরপুরের আশপাশে ভাড়ার মোটরসাইকেলই চল। প্রতিটি ভাড়া আগে ঠিক করুন। বিস্তারিত আছে সিলেটে যাওয়া ও বিভাগজুড়ে ঘোরাফেরা অধ্যায়ে।

প্রয়োজনীয় কিছু কথা
ভ্রমণের বেশির ভাগ খরচ চলে নগদে, তাই মাঝি, সিএনজিচালক আর চায়ের দোকানের জন্য খুচরা নোট রাখুন। শহরে এটিএম প্রচুর, কিন্তু সীমান্তঘেঁষা উপজেলায় কম; বিকাশ বা নগদের জন্য বাংলাদেশি নম্বর লাগে, আর কার্ড চলে মূলত সিলেট শহর ও শ্রীমঙ্গলের বড় হোটেলে।
কিছুটা রক্ষণশীল এই অঞ্চলে কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা ঢিলেঢালা পোশাকই মানানসই। মাজারে অন্যরা যেখানে জুতা খোলেন সেখানে খুলুন, মাথা ঢাকুন আর নিচু স্বরে কথা বলুন। ২০২৩ সাল থেকে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে হাফপ্যান্ট পরে ঢোকা নিষেধ, আর কবর পর্যন্ত ওঠেন কেবল পুরুষেরা; নারীরা প্রার্থনা করেন আলাদা অংশে। নামাজরত মানুষের ছবি কখনো তুলবেন না।
মেঘালয় সীমান্তের কাছে বাংলাদেশের অংশে থাকুন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নির্দেশ মানুন, চিহ্নিত সীমানা কখনো পার হবেন না আর বিজিবির চৌকির ছবি তুলবেন না। সঙ্গে পরিচয়পত্র রাখুন। জাফলংয়ে কেনা শুল্ক ছাড়া ভারতীয় পণ্য সিলেট–তামাবিল মহাসড়কের পুলিশ চেকপোস্টে জব্দ হতে পারে; দোকানের রসিদ থাকার পরও জব্দ হয়েছে বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।
সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার, জরুরি নম্বর ৯৯৯। বোতলজাত বা পরিশোধিত পানি পান করুন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে দিনের বেলাও মশা তাড়ানোর ক্রিম লাগান, আর বর্ষায় বনের পথে জোঁকের জন্য তৈরি থাকুন। বিদেশি পর্যটকেরা আগেভাগে ভিসার নিয়ম দেখে নিন। আরও আছে প্রয়োজনীয় তথ্য অধ্যায় আর বিদেশ থেকে সিলেটে গাইডে।
দায়িত্বশীল ভ্রমণ
সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি জায়গা ভঙ্গুর, কয়েকটিতে সরকারি বিধিনিষেধ চলছে। যাওয়ার আগে চলতি নিয়ম জেনে নিন, আর মাঝি উপেক্ষা করতে চাইলেও বন্ধ ফটক মেনে চলুন।
- টাঙ্গুয়ার হাওর: ২০২৬ সালের ২ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সংরক্ষণ আদেশ, ২০২৫-এর আওতায় হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সব হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে, আর হাওরে চলা প্রতিটি নৌযানের মালিক ও পরিচালককে নিবন্ধন করতে বলে। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কোনো খবর আমরা পাইনি। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পর্যটকবাহী নৌকা তখনো মাটিয়ান হাওর ও বৌলাই নদী হয়ে টেকেরঘাট পর্যন্ত যেতে পারবে; তবে ২০২৫ সাল থেকে নিয়ম কয়েকবার বদলেছে, তাই বুকিং বা টাকা দেওয়ার আগে অপারেটর ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে জেনে নিন কী অনুমতি আছে।
- বাইক্কা বিল: ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একজন সরকারি উপদেষ্টার পরিদর্শনের পর সাধারণের প্রবেশ সীমিত করা হয়, পিকনিক নিষিদ্ধ হয়, আর পর্যটক প্রবেশ নিষেধ করে নোটিশ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয়রা ডেইলি স্টারকে জানান, আদেশটি ঠিকমতো মানা হচ্ছে না; তবু তা মেনে চলুন, আর যাওয়ার আগে শ্রীমঙ্গলে খোঁজ নিন পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে কি না।
- সাদা পাথর: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অবৈধভাবে এখানকার অনেক সাদা পাথর তুলে নেওয়া হয়েছে; ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে প্রশাসন তার একটা অংশ ফিরিয়ে এনেছে। প্রতিটি পাথর যেখানে আছে সেখানেই থাকতে দিন।
- বন ও গ্রাম: শব্দ করবেন না, স্থানীয় গাইড নিন, কোনো প্রাণীকে খাওয়াবেন না আর আবর্জনা সঙ্গে ফিরিয়ে আনুন। খাসিয়া পুঞ্জি আর চা-বাগান মানুষের ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল, তাই গাইড বা আমন্ত্রণ নিয়ে যান আর ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। ড্রোন ওড়াতে আগাম অনুমতি লাগে।
প্রতিটি দিনভ্রমণে আবার ভরা যায় এমন একটি পানির বোতল আর ময়লা রাখার একটি ব্যাগ নিন, কারণ অনেক নৌকায় ময়লার ঝুড়ি থাকে না। যাওয়ার আগে পড়ে নিন দায়িত্বশীল ভ্রমণ।

এই গাইড যেভাবে সাজানো
এই অধ্যায়সহ গাইডে মোট ১৪টি অধ্যায়। বাকিগুলো হলো:
- সিলেটের ইতিহাস: তাম্রশাসন ও প্রাচীন রাজ্য, ১৩০৩ সালের বিজয়, ব্রিটিশ শাসন ও চা, লস্কর আর লন্ডনিরা, ১৯৪৭ ও ১৯৭১, আর আজ কোথায় দেখবেন সেই ইতিহাস।
- মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি: সিলেটি ভাষা ও নাগরী লিপি, মরমি গান, মণিপুরি, খাসিয়া, গারো ও চা-বাগানের জনগোষ্ঠী, উৎসব, কারুশিল্প, লন্ডনি যোগসূত্র আর গ্রামে চলাফেরার আদবকায়দা।
- মাজার, মন্দির ও পবিত্র স্থান: শাহজালাল (রহ.), শাহপরান (রহ.) ও অন্য সাধকদের মাজার, হিন্দু মন্দির ও স্নানের তীর্থ, মণিপুরি মণ্ডপ, খাসিয়া গির্জা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে ঘুরে দেখার নিয়ম।
- খাবার ও চা: সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস, আখনি, হাওরের মাছ ও হিদল, চুঙ্গা পিঠা, মণিপুরি ও খাসিয়া রান্না, সাত রঙের চা, মৌসুমি ফল আর ব্রিটেনের কারি হাউসের সঙ্গে যোগসূত্র।
- সিলেটের চা-বাগান: সিলেটে চা আসার ইতিহাস, চা কীভাবে চাষ ও তৈরি হয়, বাগানের মানুষ, আর কোথায়, কখন ও কীভাবে অতিথি হয়ে বাগান ঘুরে দেখবেন।
- হাওর, বন ও বন্যপ্রাণী: হাওর কীভাবে ভরে আর শুকায়, টাঙ্গুয়ার, হাকালুকি ও বাইক্কা বিল, পাহাড়ি বন ও জলাবন, উল্লুক ও জলচর পাখি, তাদের সামনের হুমকি আর সংরক্ষণে কারা কাজ করছেন।
- সিলেট শহর: মাজার, কিন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি, কলেজ ও জাদুঘর, শহরের চা-বাগান, কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়া, দিনভ্রমণ আর এক বা দুই দিনের ভ্রমণপথ।
- জাফলং, বিছনাকান্দি আর উত্তরের পাহাড়: লালাখাল, জৈন্তাপুর, জাফলং ও খাসিয়া পুঞ্জি, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, পান্থুমাই, সাদা পাথর ও উৎমা ছড়া, পাথর উত্তোলনের সমস্যা আর দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণপথ।
- শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার: চা-বাগান ও সাত রঙের চা, লাউয়াছড়া, বাইক্কা বিল, কমলগঞ্জ ও মাধবপুর লেক, হামহাম, মাধবকুণ্ড আর হাকালুকি, সঙ্গে তিন দিনের ভ্রমণপথ।
- সুনামগঞ্জ ও হাওর: হাওরের বারো মাস, হাছন রাজা ও শাহ আবদুল করিম, টাঙ্গুয়ার হাওর ও নৌকার নিয়মকানুন, নীলাদ্রি লেক, বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান আর তিন দিনের ভ্রমণপথ।
- হবিগঞ্জ: সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গা, চা-বাগান ও তেলিয়াপাড়া, মুড়ারবন্দের মাজার ও বিথঙ্গল আখড়া, বানিয়াচং ও হাওর, সঙ্গে তিন দিনের ভ্রমণপথ।
- প্রয়োজনীয় তথ্য: আবহাওয়া, টাকা-পয়সা, ফোন ও ভাষা, আদবকায়দা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, ছুটি, শিশু বা চলাফেরায় সীমাবদ্ধ ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ, দায়িত্বশীল ভ্রমণ আর ভিসা।
- সিলেটে যাওয়া ও বিভাগজুড়ে ঘোরাফেরা: বিমান, ট্রেন, বাস, গাড়ি, সিএনজি, নৌকা আর মোটরসাইকেল, সঙ্গে দূরত্ব, তারিখসহ ভাড়া আর যাত্রার সময়।
নির্দিষ্ট ভ্রমণ নিয়ে আছে ছোট কয়েকটি গাইড: সিলেটে দুই দিন, শ্রীমঙ্গলে সপ্তাহান্ত আর বিদেশ থেকে সিলেটে। প্রস্তুত হলে ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজান আর দেখে নিন থাকার জায়গা।
তথ্যসূত্র
এই গাইডের তথ্য অক্টোবর ২০২৬-এ নিচের সূত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, তাই খোলার সময়, ভাড়া ও নিয়মকানুন স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
- Wikipedia: Sylhet Division (2022 census figures) (en.wikipedia.org)
- Banglapedia: Sylhet District (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Shah Jalal (R) (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Sylhet Referendum, 1947 (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Tea Industry (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Haor (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Hakaluki Haor (en.banglapedia.org)
- Wikipedia: Sylhet (climate data, 1991–2020 normals) (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: 2022 India–Bangladesh floods (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Osmani International Airport (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Upaban Express (en.wikipedia.org)
- The Daily Star: Long-term plan behind high tea production (2023) (thedailystar.net)
- Wikipedia: Lawachara National Park (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Satchari National Park (en.wikipedia.org)
- Banglapedia: Shah Syed Nasiruddin (en.banglapedia.org)
- Ramsar Sites Information Service: Tanguar Haor (site no. 1031) (rsis.ramsar.org)
- Dhaka Tribune: Houseboat, tourist vessels banned in Tanguar Haor's ecological critical area (3 August 2026) (dhakatribune.com)
- Prothom Alo English: 13-point directive issued to protect Tanguar Haor (3 August 2026) (en.prothomalo.com)
- The Daily Star: Baikka Beel's silent collapse (7 February 2026) (thedailystar.net)
- The Daily Star: Looted stones being restored at Sada Pathor (2025) (thedailystar.net)
- Jago News 24: No entry in half pants at the Shahjalal shrine (2023) (jagonews24.com)
- UNB: Jaflong's shopping paradox, Indian goods openly sold in markets, seized on the road (10 July 2026) (unb.com.bd)
- Wikipedia: British Bangladeshis (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Malnicherra Tea Estate (1849 founding date) (en.wikipedia.org)
- The Financial Express: Sylhet's risky Keane Bridge opened for two-wheelers (2025) (thefinancialexpress.com.bd)
- Prothom Alo: Bus fares on Dhaka, Chattogram and long-distance routes, BRTA chart (25 April 2026) (prothomalo.com)
- Flightsfrom.com: Sylhet to Dhaka direct flights (schedules for October and November 2026) (flightsfrom.com)
- BSS: PM instruction resumes Sylhet-Manchester flights: Afroza (5 July 2026) (bssnews.net)
- UNB: Moulvibazar travel guide (2024) (unb.com.bd)
- The Daily Star: Shatchori morning (September 2016) (thedailystar.net)
- Wikipedia: Shimul Garden (en.wikipedia.org)