ছবি: Md. Alamgir Hossain (Emon), CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

অঞ্চল

জাফলং, বিছনাকান্দি আর উত্তরের পাহাড়

পড়তে ১৪ মিনিট · হালনাগাদ ২০ অক্টো, ২০২৬

জাফলং, লালাখাল, রাতারগুল, বিছনাকান্দি আর সাদা পাথর: মেঘালয় সীমান্তে সিলেটের পাথুরে নদী, জলাবন আর খাসিয়া গ্রামের গাইড।

এই অধ্যায়ে
  1. ভূমি আর মানুষ
  2. তামাবিল সড়ক: লালাখাল, জৈন্তাপুর আর শ্রীপুর
  3. জাফলং ও খাসিয়া পুঞ্জি
  4. গোয়াইনঘাট: রাতারগুল, বিছনাকান্দি আর পান্থুমাই
  5. কোম্পানীগঞ্জ: ভোলাগঞ্জ, সাদা পাথর আর উৎমা ছড়া
  6. পাথর, বালু আর নদী
  7. শুকনো মৌসুম নাকি বর্ষা
  8. নৌকা, যাতায়াত, খাবার আর থাকা
  9. সীমান্তের নিয়ম, বন্যা আর নদীতে সাবধানতা
  10. দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণপথ

সিলেট শহরের উত্তরে সমতল যেন হঠাৎ গিয়ে ঠেকেছে পাহাড়ের দেয়ালে। ধানখেত থেকে প্রায় খাড়া উঠে গেছে মেঘালয়ের খাসিয়া আর জৈন্তিয়া পাহাড়, আর সেখান থেকে নেমে আসা নদী বাংলাদেশের দিকে বয়ে আনে পানি, বালু আর পাথর। শহর থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যেই নৌকায় চড়ে যাওয়া যায় নীলচে-সবুজ নদীর উজানে, পানের লতায় ছাওয়া খাসিয়া গ্রামে হাঁটা যায়, ডুবে থাকা বনের ভেতর দিয়ে ভেসে বেড়ানো যায়, আর বসে থাকা যায় এমন এক ছড়ায়, যা সবে পাহাড় ছেড়ে নেমেছে।

অঞ্চলটি সিলেট জেলার তিনটি উপজেলা জুড়ে: জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট আর কোম্পানীগঞ্জ; তিনটিই ভারত সীমান্তঘেঁষা। প্রতিটি জায়গার নিজস্ব মৌসুম আছে; কোনটি কখন যাবেন, কীভাবে পৌঁছাবেন, আর সীমান্তের নিয়ম থেকে আকস্মিক বন্যা ও পাথর উত্তোলন পর্যন্ত কী কী মাথায় রাখবেন, এই অধ্যায়ে তা-ই বলা হয়েছে।

ভূমি আর মানুষ

সীমান্তের ওপারের পাহাড়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়: ২০২২ সালের ১৭ জুন চেরাপুঞ্জিতে এক দিনে ৯৭২ মিলিমিটার আর পাশের মৌসিনরামে ১,০০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়। এই নদীগুলোই বয়ে আনে জাফলং, বিছনাকান্দি আর সাদা পাথরের গোল পাথর, আর লালাখালের রঙের কারণ হিসেবে সাধারণত সারি নদীর চুনাপাথরের কথা বলা হয়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি ছিল জৈন্তিয়া রাজ্য। খাসিয়া বংশোদ্ভূত রাজারা পাহাড়ের পাদদেশে তাঁদের শীতকালীন রাজধানী জৈন্তাপুর থেকে রাজ্য শাসন করতেন, যতদিন না ১৮৩৫ সালের ১৫ মার্চ ব্রিটিশরা রাজ্যটি দখল করে নেয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ১৫০০ সালের দিকে এক খাসিয়া সর্দারের ছেলে আগের রাজবংশের শেষ রাজার মেয়েকে বিয়ে করে সিংহাসনে বসেন।

খাসিয়ারা আজও সীমান্ত ধরে পুঞ্জি নামের গ্রামে বাস করেন, জৈন্তাপুর আর গোয়াইনঘাটেও। তাঁদের সমাজ মাতৃসূত্রীয়: সন্তানেরা মায়ের বংশনাম পায়, আর পরিবারের বাড়ির উত্তরাধিকারী হন সবচেয়ে ছোট মেয়ে। বাংলাদেশের খাসিয়াদের বেশির ভাগ খ্রিষ্টান, আর অনেক পুঞ্জির জীবিকা বনের গাছ বেয়ে তোলা লতায় পান চাষ, সঙ্গে কমলা, সুপারি আর নানা ফল। অঞ্চলের জনগোষ্ঠী নিয়ে আরও পড়ুন মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি অধ্যায়ে।

১৯৭১ সালেও এই সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছে: কোম্পানীগঞ্জ ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের ভোলাগঞ্জ সাব-সেক্টরে, আর গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। দেখুন সিলেটের ইতিহাস।

তামাবিল সড়ক: লালাখাল, জৈন্তাপুর আর শ্রীপুর

সিলেট–তামাবিল মহাসড়ক, শিলংয়ের পুরোনো পথ, শাহপরানের মাজার পেরিয়ে উত্তর-পূর্বে চলে গেছে। বেশির ভাগ মানুষ এক লম্বা দিনে এই পথ ঘোরেন, জাফলংয়ের পথে লালাখাল আর জৈন্তাপুরে থেমে।

লালাখাল ও সারি নদী

সিলেট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে সারিঘাট সেতুতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা অপেক্ষা করে সারি নদী ধরে উজানে লালাখাল যাওয়ার জন্য। নভেম্বর থেকে মার্চ নদীর পানি স্বচ্ছ সবুজ থেকে গাঢ় নীলচে-সবুজ, দুই পাড়ে চা-বাগান, আর সামনে ক্রমেই কাছে আসে মেঘালয়ের পাহাড়। যাওয়া-আসায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে; পুরো নৌকা ভাড়া নিতে হয়, তাই রওনার আগে সময় আর ভাড়া ঠিক করে নিন।

দুপুরের আলোয় রং সবচেয়ে ভালো খোলে। ভারী বৃষ্টির পর নদী ঘোলা হয়ে যায়, আর জুন থেকে সেপ্টেম্বর থাকে খরস্রোতা ও কাদাটে, তাই লালাখাল শীতের গন্তব্য। সারি সিলেটের বালুর অন্যতম প্রধান উৎসও, আর অতিরিক্ত বালু তোলায় নদীটির ক্ষতি হচ্ছে।

নভেম্বর থেকে মার্চ লালাখালে সারি নদীর পানি নীলচে-সবুজ, যে রঙের কারণ হিসেবে সাধারণত নদীর চুনাপাথরের কথা বলা হয়।
নভেম্বর থেকে মার্চ লালাখালে সারি নদীর পানি নীলচে-সবুজ, যে রঙের কারণ হিসেবে সাধারণত নদীর চুনাপাথরের কথা বলা হয়। ছবি: Abu Sayeed, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

জৈন্তাপুর: রাজবাড়ি আর মেগালিথ

শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুরে আছে মেগালিথিক স্মৃতিস্তম্ভ, বাংলাপিডিয়ার ভাষায় যা বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র মেগালিথ। খাড়া পাথর (মেনহির) আর পাথরের পায়ার ওপর রাখা চ্যাপ্টা শিলাখণ্ড (ডলমেন) দলে দলে দাঁড়িয়ে আছে মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ডের কাছে পুরোনো জৈন্তেশ্বরী মন্দির ঘিরে, রাস্তার পাশে আর আরও দূরের মাঠে। এদের সংখ্যা নিয়ে হিসাব মেলে না: বাংলাপিডিয়ার তালিকায় ২৫টি মেনহির আর ৩২টি ডলমেন, আর ২০০৭ সালে এক সংবাদপত্রের গণনায় পাওয়া যায় ৫৫টি। মন্দিরের কাছের সবচেয়ে বড় ডলমেনটি ৬.৫ মিটার লম্বা, দাঁড়িয়ে আছে নয়টি পায়ার ওপর, আর সবচেয়ে উঁচু মেনহিরটি প্রায় ৪.৬ মিটার।

এগুলোর বয়স এখনো নিশ্চিত নয়, তবে মেগালিথ সাধারণত কবর বা স্মারক হিসেবে তৈরি হতো, আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখানে খননকাজ চালিয়েছেন। গত অর্ধশতাব্দীতে অনেক পাথর ভেঙেছে বা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই এগুলোর ওপর বসবেন না, উঠবেন না।

কাছেই রাজবাড়ি, ১৬৮০ সালের দিকে রাজা লক্ষ্মী সিংহ এটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়, এখন ধ্বংসস্তূপ। জৈন্তেশ্বরী মন্দিরের ওপরের কাঠামোর বেশির ভাগই নেই, তবে সীমানাপ্রাচীরে টিকে আছে ঘোড়া, সিংহ আর ডানাওয়ালা মূর্তির পলেস্তারার নকশা। প্রবেশ বিনামূল্যে, ভালো সময় অক্টোবর থেকে মার্চ; রাজবাড়ির গলির নির্দেশফলক ভালো নয়, তাই বাজারে জিজ্ঞেস করে নিন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র মেগালিথ হিসেবে পরিচিত জৈন্তাপুরের ডলমেন আর মেনহিরের বয়স আজও নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়নি।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র মেগালিথ হিসেবে পরিচিত জৈন্তাপুরের ডলমেন আর মেনহিরের বয়স আজও নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়নি। ছবি: Anik Sarker, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

শ্রীপুর

একই মহাসড়কে, এক হিসাবে সিলেট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর চা-বাগান, যার ভেতরে খরমপুরের টিলা; সেখানে বর্ষায় জেগে ওঠে দুটি ছোট ঝরনা, আদুরি আর মরা ঝরনা। এখানেও নদীর বুক থেকে পাথর তোলা হয়েছে।

জাফলং ও খাসিয়া পুঞ্জি

সিলেট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার, দুই ঘণ্টার পথ জাফলং, বিভাগের সবচেয়ে বেশি পর্যটক টানা জায়গাগুলোর একটি। ডাউকি নদী এখানেই বাংলাদেশে ঢোকে, আর পিয়াইন নামে ছড়িয়ে পড়ে খাড়া সবুজ পাহাড়ের নিচে চওড়া পাথুরে বুকে। বাংলাদেশের পাড় থেকে চোখে পড়ে ওপারে মেঘালয়ের উমংগট নদীর ওপর ১৯৩২ সালে ব্রিটিশদের তৈরি ডাউকি ঝুলন্ত সেতু।

শীতে ধূসর পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায় স্বচ্ছ সবুজ পানি, নৌকা ধীরে পারাপার করে। বর্ষায় নদী ঘোলা আর প্রবল, ওপারের পাহাড়ের গায়ে নামে ঝরনার রেখা। ছুটির দিনে তামাবিলের যানজট এড়াতে সকাল ৮টার মধ্যে সিলেট থেকে রওনা দিন।

নদীর ওপারে: সংগ্রামপুঞ্জি ও খাসিয়া গ্রাম

নৌকায় পিয়াইন পার হয়ে যাওয়া যায় ওপারের খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে, তার একটি সংগ্রামপুঞ্জি, যেখানে গাছ বেয়ে উঠেছে পানের লতা আর ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে খুঁটির ওপর। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আর আইএলওর কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন কর্মসূচি শুরুর পর থেকে চারটি গ্রামে হোমস্টে চালু হয়েছে, গাইডের সঙ্গে মোকামপুঞ্জির ভেতর দিয়ে ট্রেক হয়, আর একটি কমিউনিটি রেস্তোরাঁয় মেলে জা দোহর মতো খাসিয়া খাবার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঘরভাড়া রাতপ্রতি ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা বলে জানা যায়।

এগুলো মানুষের বসতি, বিনোদনকেন্দ্র নয়। গাইড আর গ্রামের আচরণবিধি মেনে চলুন, পথঘাট রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর প্রকৃতি সংরক্ষণের খরচ জোগাতে নেওয়া গ্রিন অ্যাক্টিভিটি ফি দিন, মানুষের ছবি তোলার বা কারও বাগানে ঢোকার আগে অনুমতি নিন, আর কিছু ফেলে আসবেন না।

জাফলংয়ের খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সেন্ট প্যাট্রিকস গির্জা। পিয়াইনের ওপারের খাসিয়া পুঞ্জিতে বনের গাছ বেয়ে তোলা হয় পানের লতা, আর এই পানই আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি।
জাফলংয়ের খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সেন্ট প্যাট্রিকস গির্জা। পিয়াইনের ওপারের খাসিয়া পুঞ্জিতে বনের গাছ বেয়ে তোলা হয় পানের লতা, আর এই পানই আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি। ছবি: Moheen Reeyad, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

মায়াবী ঝরনা ও তামাবিল

পিয়াইনের ওপারে খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর কাছে সীমান্তের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে মায়াবী ঝরনা, কমিউনিটি পর্যটনের পথেও এটি পড়ে। এটি বৃষ্টিনির্ভর, তাই বর্ষার দৃশ্য। স্থানীয় মাঝির সঙ্গে যান, বিজিবি আর গাইড যেখানে অনুমতি দেন সেখানেই থাকুন, আর ভেজা পাথরে উঠবেন না।

জাফলং থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে তামাবিল স্থলবন্দর, যেখান দিয়ে ভারত থেকে কয়লাবোঝাই ট্রাক আসে; পর্যটকেরাও এখান দিয়ে ডাউকি হয়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের শিলংয়ে যান। এর জন্য পাসপোর্ট আর বৈধ ভারতীয় ভিসা লাগে, আর স্থলপথে পারাপারের নিয়ম বদলায়, তাই পরিকল্পনার আগে খোঁজ নিন।

গোয়াইনঘাট: রাতারগুল, বিছনাকান্দি আর পান্থুমাই

রাতারগুল জলাবন

শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে ফতেপুর ইউনিয়নে গোয়াইন নদীর পাশে মিঠাপানির জলাবন রাতারগুল। পুরো বনের আয়তন প্রায় ৩,৩২৫ একর (প্রায় ১,৩৪৫ হেক্টর), আর ২০১৫ সালে এর মূল প্রায় ৫০৪ একর (২০৪ হেক্টর) এলাকাকে সংরক্ষিত অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। সবচেয়ে বেশি করচ গাছ, আর নথিভুক্ত প্রায় ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে আছে হিজল আর কদম।

বর্ষায়, মোটামুটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর (কোনো বছর পানি আসে মে মাসেই, থাকে অক্টোবর পর্যন্ত), গাছের গোড়ায় পানি ওঠে ৩ মিটার বা তারও বেশি, আর ছোট কাঠের নৌকা গুঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে ভেসে চলে। মোটামুটি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পানি নেমে যায়, বনের মাটির বেশির ভাগ শুকিয়ে ওঠে, তবে খাল আর নিচু খাদে কিছু পানি থেকে যায়। বানর, মাছরাঙা, বক আর গুইসাপ সহজেই চোখে পড়ে, নিচু ডালে বিশ্রাম নেয় সাপও, তাই হাত নৌকার ভেতরে রাখুন। গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে চারদিক দেখার জন্য আছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।

নৌকা ছাড়ে কয়েকটি ঘাট থেকে, যেমন রাতারগুল আর মোটরঘাট, যেতে হয় এয়ারপোর্ট রোড হয়ে; ২০২৫ সালে প্রায় ২০০ নৌকা চলছিল। কাউন্টারে বনের প্রবেশ ফি দিন (২০২০ সালে নির্ধারিত হয় প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশির জন্য ৫০ টাকা, ২০২৫ সালের শেষে যা ৫৭.৫০ টাকা বলে জানা যায়, আর বিদেশির জন্য ৫০০ টাকা), নৌকা আলাদাভাবে ভাড়া করুন। ছোট নৌকাগুলো সহজেই দোলে, তাই নিচু হয়ে বসুন এবং লাইফ জ্যাকেট চেয়ে নিন।

কংক্রিটের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আর টিকিট চালুর পর বেড়ে যাওয়া ভিড় নিয়ে পরিবেশবাদীরা সমালোচনা করেছেন, তাই ছুটির দিন এড়িয়ে সকালে যান, নিঃশব্দ থাকুন আর পানিতে প্লাস্টিক ফেলবেন না।

বর্ষার মাসগুলোতে রাতারগুলের করচ আর হিজল গাছ দাঁড়িয়ে থাকে পানিতে, তখন ভেতরে ঢোকার একমাত্র উপায় ছোট কাঠের নৌকা।
বর্ষার মাসগুলোতে রাতারগুলের করচ আর হিজল গাছ দাঁড়িয়ে থাকে পানিতে, তখন ভেতরে ঢোকার একমাত্র উপায় ছোট কাঠের নৌকা। ছবি: Jannatul Naeem Shemmi, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

বিছনাকান্দি ও পান্থুমাই

মেঘালয়ের কয়েকটি পাহাড়শ্রেণি যেখানে ভাঁজ হয়ে মিলেছে আর তাদের ছড়ার পানি ছড়িয়ে পড়েছে বড় বড় পাথরের চওড়া বুকে, সেখানেই বিছনাকান্দি। গাড়িতে সিলেট থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার, দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পথ পেরিয়ে হাদারপার বাজার, তারপর পিয়াইন ধরে প্রায় ৪০ মিনিটের নৌপথ। জুন থেকে অক্টোবর পানি ঠান্ডা, স্বচ্ছ আর বেগবান; শীতের শেষে পানি এত কমে যেতে পারে যে যাওয়া প্রায় অর্থহীন।

পাথরের ফাঁকের স্রোত দেখতে যতটা মনে হয় তার চেয়ে প্রবল, বিশেষ করে বৃষ্টির পর, আর পাথর পিচ্ছিল। গ্রিপওয়ালা স্যান্ডেল পরুন, অগভীর পানিতে আর কাছের সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে থাকুন। উত্তোলন বিছনাকান্দিতেও পৌঁছেছে, তাই পুরোনো ছবির চেয়ে পাথর কম দেখবেন।

পান্থুমাই ভারতের অংশে চওড়া এক ঝরনা, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সবচেয়ে ভালো দেখা যায় বাংলাদেশের পান্থুমাই গ্রাম থেকে, মাঠ আর নদীর ওপারে; শুকনো মাসে প্রায় মিলিয়ে যায়। হাদারপারের মাঝিরা সামান্য বাড়তি ভাড়ায় বিছনাকান্দির সঙ্গে এটি যোগ করে দেন। সকালে যান, কারণ বিকেলের দিকে প্রায়ই মেঘে ঢেকে যায়। জাফলংও গোয়াইনঘাটে, তবে সেখানে যেতে হয় তামাবিল মহাসড়ক ধরে, তাই তার জন্য আলাদা দিন রাখুন।

বিছনাকান্দিতে কয়েকটি পাহাড়শ্রেণি মিলেছে, আর তাদের ছড়ার পানি পাথরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে; জুন থেকে অক্টোবর ছড়াগুলো সবচেয়ে ভরা থাকে।
বিছনাকান্দিতে কয়েকটি পাহাড়শ্রেণি মিলেছে, আর তাদের ছড়ার পানি পাথরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে; জুন থেকে অক্টোবর ছড়াগুলো সবচেয়ে ভরা থাকে। ছবি: Sabbir Sohan, CC BY-SA 3.0, Wikimedia Commons

কোম্পানীগঞ্জ: ভোলাগঞ্জ, সাদা পাথর আর উৎমা ছড়া

কোম্পানীগঞ্জ পাথরের দেশ। সিলেট থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে ভোলাগঞ্জে ধলাই নদী মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বেরিয়ে দুই ভাগ হয়ে আবার মিলেছে, আর এর বুককে প্রায়ই দেশের সবচেয়ে বড় পাথর কোয়ারি এলাকা বলা হয়। সীমান্তে একটি স্থল শুল্ক স্টেশন আছে, আর ছাতক পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার লম্বা পুরোনো রোপওয়েটি এখন স্থানীয় দর্শনীয় জায়গা।

সাদা পাথর

সাদা পাথর ছিল এলাকার প্রধান আকর্ষণ: পাহাড়ের নিচে পাখার মতো ছড়ানো ফিকে রঙের পাথর, তার ওপর দিয়ে এমন অগভীর ঠান্ডা স্বচ্ছ পানি যে বসে থাকা যায়। সিলেট–ভোলাগঞ্জ সড়কের ঘাট থেকে নির্ধারিত ভাড়ায় যাওয়া-আসার নৌকা চলে, আর সবচেয়ে ভালো সময় জুন থেকে অক্টোবর।

যাওয়ার আগে জেনে রাখুন, জায়গাটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিপুল পরিমাণে পাথর তুলে নেওয়া হয়, আর এক বছরের মধ্যে প্রায় ১৫ একরের পর্যটন এলাকাটি প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, নদীর বুকে থেকে যায় গর্ত। ২০২৫ সালের আগস্টে জেলা প্রশাসন আর র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঢাকা পর্যন্ত বিভিন্ন মজুত থেকে পাথর উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনতে শুরু করে; ২৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৬ লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার হয় আর ১১ লাখ ঘনফুট আগের জায়গায় ফেরানো হয়, যদিও কর্মকর্তাদের ভাষ্য, লুট হওয়া পাথরের অন্তত ৩০ শতাংশ আর উদ্ধার করা যায়নি। জড়িতদের চিহ্নিত করতে হাইকোর্ট একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। যাওয়ার আগে সাম্প্রতিক ছবি দেখুন বা স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিন।

পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ধলাই খুব দ্রুত ফুলে ওঠে: ২০২৬ সালের ২১ জুন হঠাৎ পানির ঢলে সাদা পাথর এক দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। খুব ভারী বৃষ্টির পরের দিনটি এড়িয়ে চলুন, শুকনো কাপড় সঙ্গে রাখুন আর দামি জিনিস গাড়িতে রেখে যান।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাদা পাথর। ২০২৪ সালের আগস্টের পর লুটপাটে ধলাই নদীর সাদা পাথরের বুক প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, পরে তার কেবল একাংশ ফিরিয়ে আনা গেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাদা পাথর। ২০২৪ সালের আগস্টের পর লুটপাটে ধলাই নদীর সাদা পাথরের বুক প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, পরে তার কেবল একাংশ ফিরিয়ে আনা গেছে। ছবি: Firuz Ahmmed, CC0, Wikimedia Commons

উৎমা ছড়া

শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উৎমা ছড়া, সীমান্তের কাছে গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা নিরিবিলি পাথুরে ছড়া, ছোট ছোট কুণ্ড আর ধানখেত ঘেরা। কোম্পানীগঞ্জ থেকে সিএনজিতে দয়ারবাজার, তারপর শেষ অংশ স্থানীয় গাইডের সঙ্গে হেঁটে। সবচেয়ে ভালো জুন থেকে সেপ্টেম্বর; পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে নিন, আর কিছু জায়গায় উত্তোলনের খোঁড়াখুঁড়ি দেখবেন।

পাথর, বালু আর নদী

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্মাণশিল্পের চাহিদা মেটাতে এসব নদী থেকে পাথর আর বালু তোলা হয়। সিলেট জেলার আটটি কোয়ারি ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ বছরের বেশি সময় হাতে পাথর তোলার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল, তবু যন্ত্রে খোঁড়াখুঁড়ি ছড়িয়ে পড়ে: স্থানীয়ভাবে বোমা মেশিন নামে পরিচিত খননযন্ত্র নদীর বুক আর টিলা ক্ষতবিক্ষত করে, আর জাফলংয়ের আশপাশে নদীর পাড়ে চলে পাথর ভাঙার কল।

২০১২ সালে হাইকোর্ট জাফলং রক্ষার নির্দেশ দেন, আর ২০১৫ সালে নদী বরাবর প্রায় ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিত হয়। ২০১৪ সালে আদালত আটটি কোয়ারিতেই যন্ত্র দিয়ে উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছিলেন, আর ২০২০ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় খোঁড়াখুঁড়ি কমলেও বন্ধ হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় সব কোয়ারি এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি ছড়িয়ে পড়ে, আর পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, কর্তৃপক্ষ তা ঠেকাতে পারেনি। কর্মকর্তাদের হিসাবে কয়েক দিনের মধ্যে জাফলং থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর তুলে নেওয়া হয়, আর জাফলং ও ধলাই সেতুর খুঁটির কাছ থেকেও বালু তোলা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পরিবেশ মন্ত্রণালয় দেশের ১৭টি পাথর কোয়ারির ইজারাই নিষিদ্ধ করে; ২০২৬ সালের মে মাসে সীমিত আকারে হাতে পাথর তোলা আবার চালু করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে সরকার একটি কমিটি গঠন করে, আর জুনে একজন মন্ত্রী জানান, প্রথাগত পদ্ধতিতে হাতে পাথর তোলার জন্য কোয়ারিগুলো আবার খুলবে, যদিও তাতে সময় লাগতে পারে।

পর্যটকের চোখে এর প্রভাব স্পষ্ট। পুরোনো ছবির তুলনায় পাথর অনেক কম, নদীর বুকে যন্ত্রের ক্ষতচিহ্ন, আর যেখানে খোঁড়া হয়েছে সেখানে গভীরতা হঠাৎ বদলে যেতে পারে, তাই নদীর কোনো অংশকে অগভীর ধরে নেবেন না। স্মারক হিসেবে পাথর কিনবেন না।

জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে নৌকা ও শ্রমিক। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সুরক্ষিত হলেও যন্ত্রে খোঁড়াখুঁড়ি আর পাথর ভাঙার কল এখানকার নদীপাড় ক্ষতবিক্ষত করেছে।
জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে নৌকা ও শ্রমিক। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সুরক্ষিত হলেও যন্ত্রে খোঁড়াখুঁড়ি আর পাথর ভাঙার কল এখানকার নদীপাড় ক্ষতবিক্ষত করেছে। ছবি: Ifsanjry, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

শুকনো মৌসুম নাকি বর্ষা

উত্তরের দুই রূপ। নভেম্বর থেকে মার্চ নদীর পানি কম, স্বচ্ছ আর শান্ত, রাস্তা শুকনো। জুন থেকে অক্টোবর প্রতিটি ছড়া ভরে ওঠে, রাতারগুল ডোবে, ঝরনা জাগে, তবে নদী কয়েক ঘণ্টায় ফুলে উঠতে পারে; এপ্রিল আর মে মাসে আসে প্রথম ঝড়বৃষ্টি।

  • জাফলং: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি স্বচ্ছ পানি; বর্ষায় ঘোলা আর খরস্রোতা, ওপারের পাহাড়ে ঝরনা।
  • লালাখাল: নভেম্বর থেকে মার্চ নীলচে-সবুজ; ভারী বৃষ্টির পর ঘোলা।
  • জৈন্তাপুরের মেগালিথ ও রাজবাড়ি: অক্টোবর থেকে মার্চ, যখন মাটি শুকনো।
  • রাতারগুল: জুন থেকে সেপ্টেম্বর, যখন গাছ পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে; ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল বনের মাটির বেশির ভাগ শুকনো, তবে খালে কিছু পানি থাকে।
  • বিছনাকান্দি: জুন থেকে অক্টোবর, যখন ছড়াগুলো ভরা; শীতের শেষে পানি কম।
  • পান্থুমাই, মায়াবী ঝরনা আর শ্রীপুরের ঝরনা: ভরা বর্ষায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর।
  • সাদা পাথর: জুন থেকে অক্টোবর; উৎমা ছড়া: জুন থেকে সেপ্টেম্বর। খুব ভারী বৃষ্টির পরের দিন দুটিই বাদ দিন।

সিলেটে বছরে মোটামুটি ৪,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশ মে থেকে সেপ্টেম্বরে, তাই বর্ষায় খুব সকালে শুরু করুন আর বিকেল ফাঁকা রাখুন। মাসভিত্তিক পরামর্শের জন্য দেখুন কখন যাবেন এবং বর্ষার সিলেট।

নৌকা, যাতায়াত, খাবার আর থাকা

উত্তর ঘোরার সবচেয়ে সহজ উপায় সারা দিনের জন্য চালকসহ একটি গাড়ি। এ ছাড়া শিবগঞ্জ আর কদমতলী থেকে জাফলংয়ের লোকাল বাস চলে, গোয়াইনঘাট আর হাদারপারের জন্য শহর থেকে সিএনজি ভাড়া পাওয়া যায়, আর কোম্পানীগঞ্জে যেতে হয় সিলেট–ভোলাগঞ্জ সড়ক ধরে। ছুটির দিনে ভাড়া বাড়ে, তাই রওনার আগে অপেক্ষার সময়সহ সারা দিনের ভাড়া ঠিক করে নিন।

এখানকার প্রায় প্রতিটি জায়গায় নৌকা লাগে। বেশির ভাগ নৌকা জনপ্রতি নয়, যাওয়া-আসার জন্য পুরো নৌকা হিসেবে ভাড়া হয়, তবে সাদা পাথরে ঘাটের কাউন্টার থেকে নির্ধারিত ভাড়ার ব্যবস্থা ছিল। যাত্রার সময় আর অপেক্ষার সময় আগে ঠিক করুন, টাকা দিন শেষে, আর লাইফ জ্যাকেট চেয়ে নিন। ছুটির দিনে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা সত্যিকারের বিপদ, তাই নৌকা ভরা মনে হলে পরেরটির জন্য অপেক্ষা করুন।

খাবার সাদামাটা: বাজারের রেস্তোরাঁ আর প্রধান ঘাটগুলোর দোকানে ভাত, মাছের তরকারি, ডাল আর চা, আর পুঞ্জিতে খাসিয়া খাবার। হাঁটার পথে পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে নিন, আর নিজের আবর্জনা ফিরিয়ে আনুন। সিলেটি খাবারের জন্য দেখুন খাবার ও চা।

বেশির ভাগ পর্যটক সিলেট শহরে থেকে দিনে দিনে উত্তরে ঘুরে আসেন। পাহাড়ের কাছে ঘুম ভাঙতে চাইলে তামাবিল সড়ক আর জাফলংয়ের আশপাশে রিসোর্ট ও গেস্টহাউস আছে, আছে পিয়াইনের ওপারে খাসিয়া হোমস্টেও। দেখুন গোয়াইনঘাটে থাকার জায়গা, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ, অথবা সিলেট শহর।

সীমান্তের নিয়ম, বন্যা আর নদীতে সাবধানতা

এই অধ্যায়ের প্রায় সব জায়গাই ভারত সীমান্তে। বাংলাদেশের অংশে থাকুন, ছবি তোলার জন্যও কখনো চিহ্নিত সীমারেখা পার হবেন না, আর বিজিবি সদস্যরা যা বলেন তা মেনে চলুন। ওপার থেকে বাড়িয়ে দেওয়া কোনো পণ্য কিনবেন না, আর অনুমতি না থাকলে ড্রোন ব্যাগেই রাখুন।

আকস্মিক বন্যাই প্রধান প্রাকৃতিক বিপদ। ২০২২ সালের মে মাসে এবং আবার জুনে মেঘালয় ও আসামের অতিবৃষ্টিতে বিভাগজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, কোম্পানীগঞ্জ আর গোয়াইনঘাটে বহু পরিবার ঘরের চালে আশ্রয় নেয়। ছোটখাটো ঢল প্রতি বর্ষাতেই আসে: ২০২৬ সালের জুনে এমন এক ঢলে সাদা পাথর এক দিনের জন্য বন্ধ হয়, আর খবর অনুযায়ী জাফলংয়ে ১০০টির বেশি দোকান ভেসে যায়। নদীর পানি বাড়তে থাকলে, ঘোলা হলে বা ডালপালা ভেসে এলে সঙ্গে সঙ্গে নদীর বুক থেকে উঠে আসুন।

নদীগুলো শান্ত দেখালেও ঠান্ডা আর খরস্রোতা। ২০১৪ সালে পিয়াইনে পর্যটকবাহী একটি নৌকা ডুবে পাঁচজনের মৃত্যুর পর জাফলংয়ে নদীতে সাঁতার নিষিদ্ধ করা হয়। প্রতিটি নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরুন, শিশুদের হাতের নাগালে রাখুন, খরস্রোতে বা অন্ধকারে সাঁতার কাটবেন না, কোনো জায়গা বন্ধের নোটিশ মেনে চলুন, আর ঝরনার ভেজা পাথরে উঠবেন না।

বর্ষায় প্রতিদিন সকালে নদীর অবস্থা আর কোনো জায়গা বন্ধ কি না জেনে নিন, ফোন আর টাকার জন্য পানিরোধী ব্যাগ (ড্রাই ব্যাগ) রাখুন, আর সরু ব্যস্ত রাস্তায় অন্ধকার নামার আগেই ফেরার পথ ধরুন।

দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণপথ

সিলেট শহরে থাকুন, চাইলে এক রাত জাফলংয়ের কাছে। পরিকল্পনাটি শুকনো মৌসুমের; প্রতিদিনের বর্ষাকালীন বিকল্পও দেওয়া হলো।

প্রথম দিন: তামাবিল সড়ক

  • সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সিলেট থেকে রওনা।
  • দুপুরের আগে: সারিঘাট থেকে সারি নদী ধরে লালাখালে দুই-তিন ঘণ্টার নৌভ্রমণ, দুপুরের রং দেখার মতো করে সময় মিলিয়ে।
  • দুপুরের পর: জৈন্তাপুরের মেগালিথ আর রাজবাড়ি।
  • বিকেল: জাফলং; পিয়াইন পার হয়ে সংগ্রামপুঞ্জি, শেষ বিকেলের আলো দেখে ফেরা।
  • সন্ধ্যা: সিলেটে ফেরা, অথবা জাফলংয়ের কাছে রাত কাটানো।
  • বর্ষার বিকল্প: লালাখাল বাদ দিয়ে ঝরনা আর মায়াবী ঝরনার জন্য জাফলংয়ে বেশি সময় দিন।

দ্বিতীয় দিন: গোয়াইনঘাট বা খাসিয়া পাহাড়

  • শুকনো মৌসুম: গাইডের সঙ্গে সকালে খাসিয়া পুঞ্জি আর মোকামপুঞ্জির পথে হাঁটা, তারপর ফেরার পথে শ্রীপুর চা-বাগান।
  • বর্ষা: ভোরে রাতারগুলে নৌকা, তারপর হাদারপার থেকে নৌকায় বিছনাকান্দি আর পান্থুমাই, সন্ধ্যার মধ্যে সিলেটে ফেরা।

তৃতীয় দিন: কোম্পানীগঞ্জ

  • বর্ষা: খোলা থাকলে এবং অবস্থা জেনে নিয়ে সকালে সাদা পাথর, তারপর স্থানীয় গাইডের সঙ্গে উৎমা ছড়া।
  • শুকনো মৌসুম: পানি কম থাকে, তাই দিনটি কাটান সিলেট শহরের চা-বাগান আর মাজারে, অথবা চলে যান শ্রীমঙ্গলে।

শহরের জন্য দেখুন সিলেট শহর; চা-অঞ্চলের জন্য শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার। যে মৌসুমেই যান, সংযত থাকুন: এই নদী, বন আর গ্রাম এমনিতেই প্রবল চাপে।

তথ্যসূত্র

এই গাইডের তথ্য অক্টোবর ২০২৬-এ নিচের সূত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, তাই খোলার সময়, ভাড়া ও নিয়মকানুন স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

  1. Banglapedia: Jaintapur (en.banglapedia.org)
  2. The Daily Star: Journey to Jaintapur (2007) (archive.thedailystar.net)
  3. The Daily Star: Jaintapur findings unique among megalithic culture (8 March 2011) (thedailystar.net)
  4. Wikipedia: Jaintia Kingdom (en.wikipedia.org)
  5. Banglapedia: Gowainghat Upazila (en.banglapedia.org)
  6. Banglapedia: Companiganj Upazila (Sylhet District) (en.banglapedia.org)
  7. Banglapedia: The Khasia (en.banglapedia.org)
  8. Wikipedia: Jaflong (en.wikipedia.org)
  9. Wikipedia: Lalakhal (en.wikipedia.org)
  10. Wikipedia: Ratargul Swamp Forest (en.wikipedia.org)
  11. Prothom Alo English: Ratargul Swamp Forest offers livelihoods for locals (2025) (en.prothomalo.com)
  12. The Financial Express: Govt imposes entry fee for visitors at Ratargul (2020) (old.thefinancialexpress.com.bd)
  13. Wikipedia: Dawki (en.wikipedia.org)
  14. Wikipedia: Tamabil (en.wikipedia.org)
  15. Wikipedia: Bholaganj (en.wikipedia.org)
  16. Prothom Alo English: Sreepur waterfalls, Aduri and Mora Jharna (2025) (en.prothomalo.com)
  17. The Daily Star: Scenic Jaflong under assault (2017) (thedailystar.net)
  18. The Daily Star: The plunder that never stopped (2026) (thedailystar.net)
  19. The Daily Star: Looted stones being restored at Sada Pathor (2025) (thedailystar.net)
  20. The Business Standard: Sada Pathor tourist spot reopens 1 day after closure as water levels recede (2026) (tbsnews.net)
  21. Down to Earth: Four million people affected by double floods within a month in Sylhet division (2022) (downtoearth.org.in)
  22. The Financial Express: Ban on swimming in Piyaing river at Jaflong (2014) (today.thefinancialexpress.com.bd)
  23. ILO: Bangladesh Tourism Board and ILO launch community-based tourism in Jaflong (2025) (ilo.org)
  24. The Daily Star: Jaflong Khasia punji touring, more local, less tourist (thedailystar.net)
  25. The Business Standard: Forest dept's love of tourism threatens forests in Sylhet (2021) (tbsnews.net)
  26. The Daily Star: Sylhet's top 5 boat ride experiences (2023) (thedailystar.net)
  27. Wikipedia: Sylhet (climate) (en.wikipedia.org)
  28. The Business Standard: 26 lakh cubic feet of looted stones recovered in Sylhet, 11 lakh restored at Sada Pathor (August 2025) (tbsnews.net)
  29. The Financial Express: Ratargul forest choked by plastic, illegal nets (November 2025) (thefinancialexpress.com.bd)

এই গাইডের জায়গাগুলো

জাফলং
জাফলং ও গোয়াইনঘাট

জাফলং

খাসিয়া পাহাড় আর ডাউকি সেতুর নিচে পাথরের বুক বেয়ে বয়ে চলে পিয়াইন নদী।

রাতারগুল জলাবন
জাফলং ও গোয়াইনঘাট

রাতারগুল জলাবন

বাংলাদেশের হাতে গোনা মিঠাপানির জলাবনের একটি, ঘুরতে হয় ছোট কাঠের নৌকায়।

বিছনাকান্দি
এখন সবচেয়ে সুন্দর
জাফলং ও গোয়াইনঘাট

বিছনাকান্দি

কয়েক স্তরের পাহাড় এসে মিলেছে এক জায়গায়, মসৃণ পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঠান্ডা স্বচ্ছ পানি।

গাইডের আরও অধ্যায়

সিলেট ভ্রমণ গাইড
পড়তে ১৬ মিনিট

সিলেটের ইতিহাস: শ্রীহট্ট থেকে লন্ডনি যুগ

তাম্রশাসন, ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন, ব্রিটিশ আমলের চুনাপাথর ও চা, সিলেটি নাবিক আর ১৯৪৭ সালের গণভোট: অতীত যেভাবে গড়েছে আজকের সিলেট।

পড়তে ১৪ মিনিট

সিলেট বিভাগের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি

সিলেটি ভাষা ও নাগরী লিপি, মরমি গান, মণিপুরি নাচ, খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগানের উৎসব আর লন্ডনি যোগসূত্র, সঙ্গে সম্মান রেখে বেড়ানোর পরামর্শ।