ছবি: Rocky Masum, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

সিলেটকে জানুন

সিলেট বিভাগের হাওর, বন ও বন্যপ্রাণী

পড়তে ১৪ মিনিট · হালনাগাদ ২০ অক্টো, ২০২৬

হাওর কীভাবে ভরে ও শুকায়, উল্লুক আর জলচর পাখি কোথায় থাকে, কী তাদের হুমকিতে ফেলছে, আর ক্ষতি না করে এখানে বন্যপ্রাণী দেখার উপায়।

এই অধ্যায়ে
  1. ভূপ্রকৃতি: পাহাড়ে ঘেরা এক নিচু অববাহিকা
  2. হাওর কী, পানি কীভাবে ওঠানামা করে
  3. টাঙ্গুয়ার হাওর
  4. হাকালুকি, হাইল হাওর ও বাইক্কা বিল
  5. পাহাড়ি বন
  6. রাতারগুল ও অন্যান্য জলাবন
  7. যেসব প্রাণী খুঁজবেন
  8. মৌসুম ও দায়িত্বশীল আচরণ
  9. হুমকিগুলো, সোজা কথায়
  10. সংরক্ষণ: দেখভাল করে কারা

সিলেট বিভাগের মতো এতটা রূপ বদলায়, এমন অঞ্চল বাংলাদেশে কমই আছে। জানুয়ারিতে শুকনো হাওরের ওপর দিয়ে ধানখেত আর ছোট হয়ে আসা বিলের পাশ ঘেঁষে হেঁটে যাওয়া যায়; জুলাইয়ে সেই একই জমি কয়েক মিটার পানির নিচে, আর গ্রামগুলো উঁচু ভিটার ওপর দ্বীপের মতো জেগে থাকে। এই অববাহিকা ঘিরে আছে চা-বাগানে ঢাকা নিচু টিলা আর উত্তর-পূর্বের শেষ বড় পাহাড়ি বনগুলো, যেখানে সকালবেলা উল্লুকের ডাক গাছের মাথা ছাড়িয়ে ভেসে আসে।

ভূপ্রকৃতি: পাহাড়ে ঘেরা এক নিচু অববাহিকা

সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণের একটি নিচু অববাহিকা, যার তিন দিকেই ভারতের পাহাড়: উত্তরে মেঘালয়ের খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়, পূর্বে আসামের পাহাড় আর দক্ষিণে ত্রিপুরার পাহাড়। ওই সব ঢালের বৃষ্টি সরাসরি নেমে আসে এই অববাহিকায়, আর এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি গড়ে দিয়েছে মূলত এই পানিই।

এখানকার প্রধান নদী বরাক, যার উৎস মণিপুরের পাহাড়ে; বাংলাদেশে ঢোকার মুখে নদীটি দুই ভাগ হয়ে যায়। উত্তরের ধারা সুরমা সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে যায়, পানি পায় মেঘালয় থেকে নামা ছড়া থেকে; দক্ষিণের ধারা কুশিয়ারা ত্রিপুরার দিক থেকে পায় মনুর মতো নদীর পানি। ভৈরব বাজারের উজানে দুই ধারা আবার মিলে হয় মেঘনা।

এই নদীগুলোর মাঝে ও চারপাশে ছড়িয়ে আছে হাওর, বিল আর পুরোনো নদীখাতের এক বিশাল প্লাবনভূমি; বাংলাপিডিয়া বলছে, পুরো সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জের বড় অংশ এবং সিলেট ও মৌলভীবাজারের কিছু এলাকা হাওরে ঢাকা। উঁচু জমি বলতে লালচে মাটির নিচু টিলার সারি, বেশির ভাগ চা-বাগান আর টিকে থাকা বন এই টিলাতেই। উত্তরে জাফলং ও ভোলাগঞ্জের মতো জায়গায় নদীগুলো পাহাড় ছেড়ে নামে পাথরের বিছানার ওপর দিয়ে, আর সে কারণেই সেখানে পাথর উত্তোলন এত বড় সমস্যা।

হাওর কী, পানি কীভাবে ওঠানামা করে

হাওর হলো প্লাবনভূমির বিশাল বাটির মতো নিচু জায়গা, যেখানে নদী আর খালের পানি এসে জমে। শব্দটির উৎস সাধারণত ধরা হয় সংস্কৃত সাগর, সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলের উচ্চারণে যা হয়ে গেছে হাওর। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে এ অঞ্চলে প্রায় ৪৭টি বড় হাওর আর প্রায় ৬,৩০০ বিল আছে; বিল মানে হাওরের ভেতরের গভীর অংশ, যার প্রায় ৩,৫০০টিতে সারা বছর পানি থাকে।

হাওরের বছর চলে চার পর্বে, আর কখন যাচ্ছেন তার ওপরই নির্ভর করে হাওরের কোন রূপ দেখবেন:

  • ডিসেম্বর থেকে মার্চ: পানি নেমে গিয়ে পড়ে থাকে বিচ্ছিন্ন বিল, পলিমাটিতে কৃষক বোরো ধান লাগান, মাছ ধরা চলে পুরোদমে। শীতের পরিযায়ী হাঁসেরা থাকে এ সময়েই।
  • এপ্রিল-মে: বোরো ধান কাটা আর প্রথম বানের মধ্যে চলে পাল্লা; উজানের পাহাড়ে বৃষ্টি হলে অসময়ের আগাম বন্যা কাটার আগেই পাকা ধান ডুবিয়ে দিতে পারে।
  • জুন থেকে সেপ্টেম্বর: সব বিল মিলে হয়ে যায় এক জলরাশি, কোথাও গভীরতা প্রায় ৬ মিটার; গ্রামগুলো হয়ে যায় দ্বীপ, আর জুলাই থেকে জোর বাতাসে এমন ঢেউ ওঠে যে বসতভিটা ভেঙে যেতে পারে।
  • অক্টোবর-নভেম্বর: পানি নামে, কাদাচর জাগে, আর আসতে শুরু করে প্রথম পরিযায়ী পাখিরা।

হাকালুকি হাওরে শুকনো মৌসুমে খোলা পানি থাকে প্রায় ৪,৪০০ হেক্টরে, বর্ষায় তা ছাড়িয়ে যায় ১৮,০০০ হেক্টর, আর অববাহিকার কোনো কোনো অংশ সাত-আট মাস পানির নিচে থাকে।

বসতবাড়িগুলো গড়ে ওঠে হাওরের সামান্য উঁচু কিনারায় আর মাটি ফেলে উঁচু করা ভিটায়; টাঙ্গুয়ারের রামসার বিবরণী অনুযায়ী বর্ষায় এই ভিটাগুলোই প্রায় একমাত্র শুকনো জমি। ধানের পরেই প্রধান ফসল মাছ। মাসের পর মাস পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারা হিজল-করচের জলাবন একসময় বেশির ভাগ হাওরের কিনারা ঘিরে ছিল; বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, তা এখন কয়েকটি ছোট টুকরায় এসে ঠেকেছে।

বর্ষায় হাওরের গ্রামগুলো দাঁড়িয়ে থাকে উঁচু ভিটায়; স্কুল থেকে বাজার, সব যাতায়াতই তখন নৌকায়।
বর্ষায় হাওরের গ্রামগুলো দাঁড়িয়ে থাকে উঁচু ভিটায়; স্কুল থেকে বাজার, সব যাতায়াতই তখন নৌকায়। ছবি: Balaram Mahalder, CC BY-SA 3.0, Wikimedia Commons

টাঙ্গুয়ার হাওর

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোর একটি। ১৯৯৯ সালে একে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়, আর ১০ জুলাই ২০০০ এটি সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইটের স্বীকৃতি পায়। রামসারের হিসাবে আয়তন ৯,৫০০ হেক্টর; সীমানা কীভাবে ধরা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে দেশীয় প্রতিবেদনে প্রায় ১২,৬৫০ হেক্টর পর্যন্ত হিসাব পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক হিসাবে এটি ৫৪টি পরস্পরযুক্ত বিলের এক জাল, মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে, কিনারায় হিজল আর করচের সারি; দেশের মিঠাপানির মাছের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্রও এটি।

পাখি ও মাছ

রামসারের তথ্যমতে এখানে অন্তত ২০৮ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে, যার ৯৮টি পরিযায়ী, আর মাছ আছে অন্তত ১৩৫ প্রজাতির; ওই বিবরণী অনুযায়ী বিপন্ন শিকারি পাখি পালাসের কুড়া ঈগল হাওরেই বাসা বাঁধে। শীতের পাখির সংখ্যা বছরে বছরে অনেক ওঠানামা করে: ছয়টি বিলের এক গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ২৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৭ হাজার জলচর পাখি গোনা হয়েছে, আর বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের শুমারিতে ২০১৮ সালের প্রায় ৬০ হাজার পাখি ২০২২ সালে নেমে এসেছে ২৭ হাজারের সামান্য ওপরে।

যেসব প্রজাতির প্রবণতা মাপা গেছে, তার অর্ধেকের বেশির সংখ্যা কমছে। মহাবিপন্ন ডুবুরি হাঁস বেয়ারের ভুতিহাঁস ১৯৯০-এর দশকের পর বাংলাদেশে প্রায় ৯৯ শতাংশ কমে গেছে বলে জানা যায়।

হাওরের মানুষ

টাঙ্গুয়ার ও এর চারপাশের ৮৮টি গ্রামে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বাস, যাঁদের বেশির ভাগের জীবিকা এই হাওরনির্ভর। প্রায় ৭০ বছর এর জলমহাল ইজারা দেওয়া হতো, আর ইজারাদারির কারণে স্থানীয় জেলেরা প্রায়ই মাছ ধরার সুযোগ পেতেন না; ১৯৯৯ সালের পর ইজারা বন্ধ হয়, পরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যায় জেলা প্রশাসনের হাতে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩৩ কোটি টাকার দীর্ঘ এক আইইউসিএন সমাজভিত্তিক কর্মসূচির লক্ষ্য অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেছে; ২০২৫ সালের মে মাসে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির অর্থায়নে শুরু হয়েছে নতুন একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প।

২০২৫ ও ২০২৬ সালের নিয়মে টাঙ্গুয়ার ভ্রমণ

পর্যটন বেড়েছে দ্রুত, ক্ষতিও বেড়েছে সমান তালে। স্থানীয়দের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতি বর্ষায় প্রায় ২০০ হাউসবোট হাওরে চলত, সঙ্গে জেনারেটরের শব্দ, উচ্চ স্বরে গান, রাতের আলো আর সেই পানিতেই ফেলা বর্জ্য, যে পানিতে গ্রামের মানুষ গোসল করেন। ২১ জুন ২০২৫ সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য ১২ দফা আচরণবিধি জারি করে, আর ৬ নভেম্বর ২০২৫ জারি হয় টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ।

২ আগস্ট ২০২৬ জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সব হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান নিষিদ্ধ করে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যটকবাহী নৌকা তখনো মাটিয়ান হাওর ও বৌলাই নদী হয়ে টেকেরঘাট পর্যন্ত যেতে পারত। জেলা প্রশাসন ১৩ দফা নির্দেশনাও জারি করে:

  • প্রতিটি হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানকে জেলা প্রশাসনে নিবন্ধন করতে হবে।
  • নৌযানে উচ্চ শব্দে গান, মাইক্রোফোন বা পার্টি চলবে না।
  • একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, পানিতে কিছুই ফেলা যাবে না; হাউসবোটে লাগবে দুটি ময়লার ঝুড়ি, পানির ফিল্টার ও সেপটিক ট্যাংক।
  • হাউসবোটের দৈর্ঘ্য ১০০ ফুটের (প্রায় ৩০ মিটার) বেশি হবে না।
  • লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে নিরাপদে।
  • পর্যটক আচরণবিধি ও জরুরি নম্বর টাঙিয়ে রাখতে হবে, আর প্রতিটি যাত্রার আগে আচরণবিধি বুঝিয়ে বলতে হবে।
  • ঝড়, ভারী বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কোনো যাত্রা নয়।

২০২৫ সাল থেকে এখানকার নিয়ম কয়েকবার বদলেছে। অগ্রিম টাকা দেওয়ার আগে অপারেটরের নিবন্ধন আর অনুমোদিত পথ দেখে নিন, জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিও মিলিয়ে নিন। বিস্তারিত দেখুন হাউসবোট গাইডে।

সুনামগঞ্জে একটি হিজলগাছ। মাসের পর মাস পানিতে ডুবে থেকেও টিকে থাকে হিজল, আর বর্ষায় এর সারি মেঘালয়ের পাহাড়ের পটভূমিতে টাঙ্গুয়ারের বিলগুলোর সীমানা চিনিয়ে দেয়।
সুনামগঞ্জে একটি হিজলগাছ। মাসের পর মাস পানিতে ডুবে থেকেও টিকে থাকে হিজল, আর বর্ষায় এর সারি মেঘালয়ের পাহাড়ের পটভূমিতে টাঙ্গুয়ারের বিলগুলোর সীমানা চিনিয়ে দেয়। ছবি: Amirhusenjihed, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

হাকালুকি, হাইল হাওর ও বাইক্কা বিল

হাকালুকি হাওর

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৮১ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এর ২৩৮টির বেশি বিলে পানি আসে জুড়ী ও সোনাই-বরদলের মতো নদী দিয়ে। চারপাশে প্রায় ২ লাখ মানুষের বাস, আর ১৯৯৯ সালে এটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিত হয়।

হাকালুকি মূলত শীতের হাওর: বাংলাপিডিয়ার তালিকায় এখানে ৪০০-র বেশি প্রজাতির পাখি, আর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পরিযায়ী জলচর পাখিই প্রধান আকর্ষণ; আশপাশে আছে ভোঁদড়, মিঠাপানির কাছিম আর মুখপোড়া হনুমানও। দূরত্ব অনেক, তাই এমন মাঝি ঠিক করুন, যিনি জানেন সেই মৌসুমে পাখি কোথায় বসছে।

হাইল হাওর ও বাইক্কা বিল

শ্রীমঙ্গলের পাশের বিস্তীর্ণ জলাভূমি হাইল হাওর, আর এর ভেতরের বাইক্কা বিল দেখায় সুরক্ষা পেলে প্রকৃতি কতটা ফিরে আসে। ১ জুলাই ২০০৩ ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারার আয় ছেড়ে দিয়ে বিলের তিনটি জলমহাল, মোট প্রায় ১০০ হেক্টর, স্থায়ী অভয়াশ্রম করে। তখন থেকে স্থানীয় মানুষের সংগঠন বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন এটি পাহারা দিচ্ছে, আর এখানে মাছ ধরা, শিকার ও জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ নিষিদ্ধ।

ইউএসএআইডির সহায়তায় মাচ প্রকল্প বিলের কিছু অংশ খুঁড়ে গভীর করা, জলাবনের গাছ আবার লাগানো আর একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরিতে সাহায্য করে, যাকে ২০০৭ সালে দেশের কোনো জলাভূমিতে প্রথম টাওয়ার বলা হয়েছিল; প্রকল্পের হিসাবে এরপর হাইল হাওরের বাকি অংশে মাছ ধরার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়। ২০০৭ সাল নাগাদ অভয়াশ্রমে ১০৩ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত হয়, তার মধ্যে পালাসের কুড়া ঈগল ও বড় গুটি ঈগলও।

তবে অভয়াশ্রমটি এখন চাপে। ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পলি জমে জলাভূমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে গেছে, রাতে মাছ চুরি হয়, কখনো অস্ত্রধারী দলের হাতে, আর পাহারায় আছেন মাত্র চারজন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে অভয়াশ্রমে সাধারণের প্রবেশ বন্ধ করে এবং পিকনিক নিষিদ্ধ করে, যদিও স্থানীয়দের ভাষ্য, সে নির্দেশ ঠিকমতো মানা হয় না। যাওয়ার আগে জেনে নিন পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে কি না, আর অনুমতি মিললে হাঁটাপথ ও টাওয়ারের বাইরে যাবেন না।

বাইক্কা বিলে সূর্যোদয়। ২০০৭ সালে এর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারটিকে দেশের কোনো জলাভূমিতে এ ধরনের প্রথম টাওয়ার বলা হয়েছিল; এখান থেকে দেখা যায় ২০০৩ সালে গড়ে তোলা এমন এক অভয়াশ্রম, যেখানে মাছ ধরা ও শিকার নিষিদ্ধ।
বাইক্কা বিলে সূর্যোদয়। ২০০৭ সালে এর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারটিকে দেশের কোনো জলাভূমিতে এ ধরনের প্রথম টাওয়ার বলা হয়েছিল; এখান থেকে দেখা যায় ২০০৩ সালে গড়ে তোলা এমন এক অভয়াশ্রম, যেখানে মাছ ধরা ও শিকার নিষিদ্ধ। ছবি: Faisal Akram, CC BY-SA 2.0, Wikimedia Commons

পাহাড়ি বন

এ বিভাগের বনগুলো নিচু টিলার ওপর মিশ্র আধা-চিরসবুজ বন, যার মাঝে মাঝে চা-বাগান, গ্রাম, সড়ক আর রেললাইন। কোনোটিই বড় নয়, বেশির ভাগেই গাছ কাটা হয়েছে বা নতুন করে লাগানো হয়েছে; তবু সব মিলিয়ে এখানে টিকে আছে উল্লুক, হনুমান, লজ্জাবতী বানর আর শত শত প্রজাতির পাখি।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

সবচেয়ে পরিচিত লাউয়াছড়া, শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে কমলগঞ্জ উপজেলায়: পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১,২৫০ হেক্টর, বনটি প্রথম সংরক্ষিত হয় ১৯১৭ সালে, আর ৭ জুলাই ১৯৯৬ থেকে জাতীয় উদ্যান। ১৯২০-এর দশক থেকে কেটে নতুন করে লাগানো জমিতেই বনের বড় অংশ আবার গড়ে উঠেছে, তবু এখানে প্রায় ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ১৬০-র বেশি প্রজাতির প্রজাপতি, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ আর ২০ থেকে ২৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী নথিভুক্ত।

লাউয়াছড়ার খ্যাতি উল্লুকের জন্য: লেজহীন এই বনমানুষ থাকে ছোট পারিবারিক দলে, সকালে উঁচু গলায় গান গায়, আর বিশ্বজুড়ে বিপন্ন, বাংলাদেশে মহাবিপন্ন। ২০০৭ সালের শুমারিতে ১৭টি দলে ৬২টি উল্লুক পাওয়া যায়; ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক জরিপে গোনা হয়েছে ১৩টি পরিবারে ৪৮টি। গাইডদের মতে, সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রায়ই ডাক শুরু হয়, তাই এর আগেই ট্রেইলে পৌঁছান। গাছের মাথায় একই সঙ্গে থাকে মুখপোড়া হনুমান ও চশমাপরা হনুমান, আর রাতে বের হয় লজ্জাবতী বানর।

শ্রীমঙ্গলের পূর্ব দিকের রেললাইন বনের ঠিক মাঝখান দিয়ে গেছে, গেছে সড়ক আর বিদ্যুতের লাইনও। দ্য ডেইলি স্টারের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালের হলিউড চলচ্চিত্র অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ-এর কিছু দৃশ্য এখানে ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে লাউয়াছড়া দাঁড়িয়েছিল ভারতের বনের ভূমিকায়। উদ্যানের ভেতরে ও আশপাশে খাসিয়া, ত্রিপুরা ও মণিপুরি জনগোষ্ঠীর বাস; লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া নামের দুটি খাসিয়া পুঞ্জি উদ্যানের ভেতরে বা সীমানা ঘেঁষে।

১৪ জুন ১৯৯৭ মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণে সংরক্ষিত বনের প্রায় ৭০০ একর পুড়ে যায়। এখনকার চাপ যানবাহন, ট্রেন আর ভিড়ের: ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের গতিসীমা প্রায় কেউ মানে না, সড়কে প্রায়ই গাড়ির চাকায় বন্যপ্রাণী মারা পড়ে, আর চিহ্নহীন সীমানা পেরিয়ে দখলদারেরা বনের জমি গ্রাস করছে।

লাউয়াছড়ার উল্লুকেরা থাকে ছোট পারিবারিক দলে; সকালের জোরালো ডাক শুনেই এদের খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে সহজ।
লাউয়াছড়ার উল্লুকেরা থাকে ছোট পারিবারিক দলে; সকালের জোরালো ডাক শুনেই এদের খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে সহজ। ছবি: Abdul Momin, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা ও সিলেটের বন

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার প্রায় ২৪৩ হেক্টরের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয় ১০ অক্টোবর ২০০৫; নামের অর্থ সাতটি ছড়া। এখানে আছে উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, রেসাস ও উল্টোলেজি বানর, আর উদয়ী পাকরা ধনেশ ও লালমাথা কুচকুচির মতো পাখি। বিস্তারিত দেখুন হবিগঞ্জ অধ্যায়ে।

হবিগঞ্জেরই রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য প্রায় ১,৭৯৫ হেক্টর জুড়ে এ বিভাগের সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত বন, ভিড়ও লাউয়াছড়ার চেয়ে অনেক কম। সিলেট জেলায় আছে দুটি ছোট সংরক্ষিত এলাকা: ১৩ এপ্রিল ২০০৬ ঘোষিত প্রায় ৬৭৯ হেক্টরের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, আর একই বছর চালু হওয়া প্রায় ৪৫ হেক্টরের টিলাগড় ইকোপার্ক।

রাতারগুল ও অন্যান্য জলাবন

মিঠাপানির জলাবন একসময় হাওর অববাহিকার বড় অংশ ঘিরে ছিল। এর সবচেয়ে পরিচিত টিকে থাকা নমুনা রাতারগুল, গোয়াইনঘাটে গোয়াইন নদীর পাশে, সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে: প্রায় ৩,৩২৫ একর (১,৩৪৫ হেক্টর) বন, যার মূল ২০৪ হেক্টর ৩১ মে ২০১৫ বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষিত হয়। দীর্ঘদিন একে দেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন বলা হতো; এখন জুগিরকান্দি মায়াবন ও লক্ষ্মীবাওরের মতো আরও কয়েকটির খোঁজ মিলেছে, তবে কোনোটিই এত পরিচিত নয়।

এখানে সবচেয়ে বেশি করচগাছ, সঙ্গে হিজল, কদম আর মুর্তা। বর্ষায়, মোটামুটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর (কোনো বছর পানি আসে মে মাসেই, থাকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত), গাছের গোড়ায় পানি থাকে ৩ মিটার বা তারও বেশি, তখন ঘুরতে হয় ছোট কাঠের নৌকায়। মোটামুটি ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল বনের মাটির বেশির ভাগ শুকিয়ে ওঠে, তবে খাল আর নিচু খাদে কিছু পানি থেকে যায়। লাগবে বন বিভাগের টিকিট আর স্থানীয় নৌকা।

খালে খালে শিকার খোঁজে বক, সাদা বক আর মাছরাঙা, আর নিচু ডালে বিশ্রাম নেয় গুইসাপ ও সাপ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঘাটভেদে নৌকাভ্রমণের ভাড়া ছিল ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, প্রাপ্তবয়স্কের টিকিট ৫৭.৫০ টাকা; নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নিন।

সমস্যা জনপ্রিয়তাই: ডালে ডালে আটকে থাকে প্লাস্টিক, অনেক নৌকায় ময়লার ঝুড়ি নেই, আর বন বিভাগ, মাঝি ও সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিযানের পরও রাতে পাতা হয় নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল। কর্মদিবসে সকাল সকাল যান, নিরিবিলি খালের দিকে নিতে বলুন, আর নিজের আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

বর্ষায় রাতারগুলের করচগাছ দাঁড়িয়ে থাকে গভীর পানিতে, তখন বনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় ছোট কাঠের নৌকায়।
বর্ষায় রাতারগুলের করচগাছ দাঁড়িয়ে থাকে গভীর পানিতে, তখন বনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় ছোট কাঠের নৌকায়। ছবি: Ahnaf Tahmid Manan, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

যেসব প্রাণী খুঁজবেন

বানরজাতীয় প্রাণী

দেখার আগে কান পাতুন: উল্লুক পরিবারের জোরালো, ক্রমশ চড়তে থাকা যুগল ডাক বহুদূর যায়, আর তা শোনার সেরা জায়গা লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি। মুখপোড়া হনুমান দেখা সহজ, প্রায়ই গাছের ওপরের দিকে খেতে দেখা যায়; একই বনে থাকে চশমাপরা হনুমানও। বনের কিনারায় দেখা মেলে বানরের, আর নিশাচর লজ্জাবতী বানর কদাচিৎ চোখে পড়ে।

পাখি

শুধু লাউয়াছড়াতেই প্রায় ২৪৬ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত। বনে খুঁজুন উদয়ী পাকরা ধনেশ, লালমাথা কুচকুচি, বনমোরগ আর কাছাড়ি বুলবুল। নভেম্বর থেকে মার্চ হাওর ভরে ওঠে হাঁস, বুনোহাঁস, সৈকত পাখি আর পালাসের কুড়া ঈগল ও বড় গুটি ঈগলের মতো শিকারি পাখিতে; কোনো কোনো শীতে দু-একটি বেয়ারের ভুতিহাঁসও আসে।

সরীসৃপ, প্রজাপতি ও স্তন্যপায়ী

লাউয়াছড়ায় আছে ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬ প্রজাতির উভচর, তার মধ্যে অজগরও, আর ১৬০-র বেশি প্রজাতির প্রজাপতি, যাদের খুঁজতে হয় রোদ পড়া ছড়ার ধারে। রাতারগুলের আশপাশে গুইসাপ বেশ দেখা যায়, আর হাওরে এখনো মিঠাপানির কাছিম টিকে আছে, যদিও রামসার বিবরণী বলছে সেগুলো ব্যাপকভাবে শিকার হয়।

বড় স্তন্যপায়ীরা লাজুক, সহজে দেখা দেয় না। লাউয়াছড়ায় আছে মায়া হরিণ, বুনো শূকর, চিতা বিড়াল আর চীনা বনরুই; হাকালুকিতে ভোঁদড় আছে, শুশুকের কথাও নথিতে পাওয়া যায়; আর সাতছড়ির আশপাশে অতি অল্প সংখ্যায় টিকে আছে এশীয় কালো ভালুক ও বনকুকুর।

লাউয়াছড়া ও সাতছড়িতে উল্লুকের পাশাপাশি থাকে মুখপোড়া হনুমান, আছে হাকালুকি হাওরের আশপাশের বনেও।
লাউয়াছড়া ও সাতছড়িতে উল্লুকের পাশাপাশি থাকে মুখপোড়া হনুমান, আছে হাকালুকি হাওরের আশপাশের বনেও। ছবি: AKM Emdadul Islam Bitu, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

মৌসুম ও দায়িত্বশীল আচরণ

কখন যাবেন

  • নভেম্বর থেকে মার্চ: জলচর পাখি দেখার সেরা সময়। বর্ষার শেষে পরিযায়ীরা আসে, ফিরে যায় মার্চের শেষ নাগাদ, প্রধান শুমারি হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে, আর বনের ট্রেইলও তখন শুকনো।
  • এপ্রিল-মে: গরম, হাওরে পানি সবচেয়ে কম, আগাম বানের ঝুঁকিও থাকে। হাঁসেরা চলে গেছে, তাই বন্যপ্রাণী দেখার জন্য এটিই সবচেয়ে কম সুবিধার সময়।
  • জুন থেকে অক্টোবর: হাওর আর রাতারগুল পানিতে টইটম্বুর, বনও সবচেয়ে সবুজ; তবে কাদা আর জোঁকের জন্য তৈরি থাকুন।

বনে যান ফটক খোলার সঙ্গে সঙ্গে, আর শুক্রবার ও ছুটির দিন এড়িয়ে চলুন, তখন উদ্যানগুলো দিনভ্রমণকারীতে ভরে যায়। মাসভিত্তিক আবহাওয়ার জন্য দেখুন কখন যাবেন।

দায়িত্বশীলভাবে বন্যপ্রাণী দেখা

এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বন্যপ্রাণী থাকে ছোট, ভিড়ভাট্টার সংরক্ষিত এলাকায়, তাই পর্যটকের আচরণ সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ:

  • উদ্যানের অফিস থেকে প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড নিন। অনেকে নিসর্গ কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, আর তাঁদের পারিশ্রমিক যায় এমন মানুষের হাতে, বন রক্ষায় যাঁদের নিজেদের স্বার্থ আছে।
  • চুপচাপ থাকুন, দল ছোট রাখুন; চিৎকার বা গান শুনলে বানরজাতীয় প্রাণীরা সরে যায়।
  • বানর বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীকে কখনো খাবার দেবেন না, আর পাখি ডেকে আনতে রেকর্ড করা ডাক বাজাবেন না।
  • বন বিভাগের লিখিত অনুমতি না থাকলে বন বা পাখির অভয়াশ্রমের ওপর ড্রোন ওড়াবেন না।
  • বারবার ভরা যায় এমন পানির বোতল নিন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলুন, আর প্রতিটি মোড়ক ফিরিয়ে আনুন।
  • বুনো পাখি, কাছিম বা বন্যপ্রাণীর মাংস কখনো কিনবেন না; জাল বা বিষটোপ দেখলে বন বিভাগকে জানান।
  • লাউয়াছড়া ও সাতছড়ির ভেতর দিয়ে ধীরে গাড়ি চালান, আর রেললাইন থেকে দূরে থাকুন।

হুমকিগুলো, সোজা কথায়

পাথর ও বালু উত্তোলন

উত্তরের নদীগুলো পাহাড় থেকে পাথর বয়ে আনে, আর ২০২৪ সালের আগস্টের পর সেই পাথর তোলা প্রকাশ্য লুটে রূপ নেয়: প্রশাসনের হিসাবে কয়েক দিনের মধ্যে শুধু জাফলং থেকেই প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর সরানো হয়, আর বছর না ঘুরতেই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্রের ১৫ একর জায়গা পাথরশূন্য হয়ে যায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেশের ১৭টি পাথর কোয়ারির সবগুলোর ইজারা বন্ধ হয়, যার আটটি সিলেটে; তবু ২০২৬ সালেও সাংবাদিকেরা ভোরে ও রাতে পাথর তোলার দৃশ্য দেখেছেন। এতে নদীর তলদেশ তছনছ হয়, ভাঙন বাড়ে, কোথাও কোথাও টিলা পর্যন্ত মিলিয়ে গেছে।

জলাভূমি কমে যাওয়া

টাঙ্গুয়ারে এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় তিন দশকে মূল হাওরের প্রায় পাঁচ ভাগের দুই ভাগ কৃষিজমি বা বসতিতে পরিণত হয়েছে, গভীর পানির অনেক জায়গা হয়ে গেছে অগভীর ধানি জমি। জলাবন টিকে আছে টুকরো টুকরো হয়ে, বাইক্কার মতো বিল ভরে যাচ্ছে পলিতে, আর ২০২১ সালে প্রকাশিত এক হিসাবে, এক দশকের মধ্যে হাওর অঞ্চলের ১৪০ প্রজাতির মাছের প্রায় ৬২টি প্রায় হারিয়ে গেছে। পোষা হাঁস, গরু আর নৌকার চলাচলে পাখিরা বিরক্ত হয়, আর জলচর পাখি এখনো জালে ধরা হয়, বিষ দিয়ে মারা হয়।

বন উজাড়

সড়ক, রেললাইন আর বিদ্যুতের লাইন টিলার বনগুলোকে টুকরো করেছে, সীমানা চিহ্নিত না থাকায় দখলদারেরা ঢুকে পড়ছে, আর ভিড়, যানবাহন ও শব্দে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও খাবার খোঁজায় ব্যাঘাত ঘটছে। লাউয়াছড়ায় উদ্যানের ভেতরেই গড়ে উঠেছে বাজার, আর ২০১৭ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া সীমানা নির্ধারণের কাজ মাঝপথে থেমে গেছে।

বন্যা

বোরো কাটার আগে অসময়ের আগাম বন্যা একটি কৃষক পরিবারের সারা বছরের ফসল কেড়ে নিতে পারে, আর বর্ষার চূড়ায় রাস্তা ডোবে, ভিটা তলিয়ে যায়। পর্যটকের জন্য শিক্ষাটা সহজ: পাহাড়ে ভারী বৃষ্টির পর এখানকার নদী দ্রুত ফুলে ওঠে, তাই আবহাওয়ার সতর্কবার্তা মানুন, ঝড়ের মধ্যে কখনো নৌকায় উঠবেন না, আর যাত্রা বাতিল হলে মেনে নিন।

জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে এক মাঝি। পিয়াইনসহ উত্তরের নদীগুলোতে পাথর উত্তোলন নদীর তলদেশ আর এ অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত কিছু দর্শনীয় স্থান ক্ষতবিক্ষত করেছে।
জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে এক মাঝি। পিয়াইনসহ উত্তরের নদীগুলোতে পাথর উত্তোলন নদীর তলদেশ আর এ অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত কিছু দর্শনীয় স্থান ক্ষতবিক্ষত করেছে। ছবি: Ifsanjry, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

সংরক্ষণ: দেখভাল করে কারা

২০০০-এর দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশ এসব জায়গার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আশপাশের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে বন বিভাগের সঙ্গে পরিচালিত নিসর্গ সহায়তা প্রকল্প (২০০৩-২০০৮) পাঁচটি সংরক্ষিত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সহ-ব্যবস্থাপনা চালু করে, তার মধ্যে ছিল লাউয়াছড়া, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গা। পরের দুই প্রকল্প, সমন্বিত রক্ষিত এলাকা সহ-ব্যবস্থাপনা বা আইপ্যাক (২০০৮-২০১৩) এবং জলবায়ু সহনশীল প্রতিবেশ ও জীবিকা বা ক্রেল (২০১৩-২০১৭), একে ছড়িয়ে দেয় প্রথমে ১৮টি, পরে ২২টি এলাকায়।

সহ-ব্যবস্থাপনার আওতায় থাকা সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে গ্রামবাসী, কর্মকর্তা ও অন্যদের নিয়ে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে, পাশে আছে কমিউনিটি টহল দল, যার সদস্যরা মাসে ছয় থেকে আট দিন বনে টহল দেন, বেশির ভাগই স্বেচ্ছাশ্রমে; ২০০৬ সালের পর দায়িত্ব পালনকালে তিনজন নিহত হয়েছেন। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী আইনের সংশোধনীতে এ ব্যবস্থা আইনি স্বীকৃতি পায়। জলাভূমিতে মাচ প্রকল্প গড়ে তুলেছে বাইক্কা বিল পাহারা দেওয়া সংগঠনের মতো সমাজভিত্তিক সংগঠন।

ফল মিশ্র: গবেষকেরা বলছেন, সহ-ব্যবস্থাপনা স্থানীয় সমর্থন গড়ে তুলেছে, তবে কমিটিগুলো এখনো প্রকল্পের টাকার ওপর নির্ভরশীল, আর উদ্যানের টিকিটের আয়ের ভাগ সব সময় পায় না। আপনার প্রবেশ টিকিট, একজন স্থানীয় গাইড আর পাশের গ্রামের একজন মাঝি, ছোট হলেও বাস্তব অবদান।

যাওয়ার আগে পড়ে নিন দায়িত্বশীল ভ্রমণ, আর প্রতিটি এলাকার ব্যবহারিক তথ্যের জন্য এই অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন সুনামগঞ্জ ও হাওর এবং শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার।

তথ্যসূত্র

এই গাইডের তথ্য অক্টোবর ২০২৬-এ নিচের সূত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, তাই খোলার সময়, ভাড়া ও নিয়মকানুন স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

  1. Ramsar Sites Information Service: Tanguar Haor (site no. 1031) (rsis.ramsar.org)
  2. Prothom Alo: Tanguar Haor: Existence at stake, nature faces depletion (2025) (en.prothomalo.com)
  3. Dhaka Tribune: Houseboat, tourist vessels banned in Tanguar Haor's ecological critical area (August 2026) (dhakatribune.com)
  4. Prothom Alo: Sunamganj district administration's houseboat directive for Tanguar Haor (3 August 2026) (en.prothomalo.com)
  5. Avian Conservation and Ecology: waterbird population trends at Tanguar Haor, 2008 to 2021 (2023) (ace-eco.org)
  6. Banglapedia: Haor (en.banglapedia.org)
  7. Banglapedia: Hakaluki Haor (en.banglapedia.org)
  8. The Daily Star, Star Weekend Magazine: Baikka Beel under Threat (2 February 2007) (archive.thedailystar.net)
  9. The Daily Star: Baikka Beel's silent collapse (February 2026) (thedailystar.net)
  10. Wikipedia: Surma River (en.wikipedia.org)
  11. Wikipedia: Lawachara National Park (en.wikipedia.org)
  12. Asia News Network (The Daily Star): Inside Bangladesh's Lawachara: beauty thrives amid mounting threats (February 2026) (asianews.network)
  13. The Daily Star: Finding Ulluk (15 February 2013) (thedailystar.net)
  14. Wikipedia: Ratargul Swamp Forest (en.wikipedia.org)
  15. The Financial Express: Ratargul forest choked by plastic, illegal nets (November 2025) (thefinancialexpress.com.bd)
  16. PARKS (IUCN): Uddin and Parr, co-management of protected areas in Bangladesh (2018) (parksjournal.com)
  17. The Daily Star: The plunder that never stopped (August 2026) (thedailystar.net)
  18. Wikipedia: List of protected areas of Bangladesh (en.wikipedia.org)
  19. Prothom Alo: Silent cry of the wetlands (February 2021) (en.prothomalo.com)
  20. Wikipedia: Satchari National Park (en.wikipedia.org)
  21. The Daily Star: A haven for hoolock gibbons (April 2025) (thedailystar.net)
  22. bioRxiv: Comprehensive surveys of western hoolock gibbons in Bangladesh (2025 preprint) (biorxiv.org)

এই গাইডের জায়গাগুলো

টাঙ্গুয়ার হাওর
বিধিনিষেধ আছে
সুনামগঞ্জ ও টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওর

মেঘালয় পাহাড়ের নিচে রামসার জলাভূমি, যেখানে আছে জলাবনের গাছ, দ্বীপের মতো গ্রাম আর শীতের জলচর পাখি।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
এখন সবচেয়ে সুন্দর
শ্রীমঙ্গল

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, যেখানে গাছের মাথায় উল্লুকের ডাক শোনা যায় আর মাঝ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন।

রাতারগুল জলাবন
জাফলং ও গোয়াইনঘাট

রাতারগুল জলাবন

বাংলাদেশের হাতে গোনা মিঠাপানির জলাবনের একটি, ঘুরতে হয় ছোট কাঠের নৌকায়।

গাইডের আরও অধ্যায়

সিলেট ভ্রমণ গাইড
পড়তে ১৬ মিনিট

সিলেটের ইতিহাস: শ্রীহট্ট থেকে লন্ডনি যুগ

তাম্রশাসন, ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন, ব্রিটিশ আমলের চুনাপাথর ও চা, সিলেটি নাবিক আর ১৯৪৭ সালের গণভোট: অতীত যেভাবে গড়েছে আজকের সিলেট।

পড়তে ১৪ মিনিট

সিলেট বিভাগের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি

সিলেটি ভাষা ও নাগরী লিপি, মরমি গান, মণিপুরি নাচ, খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগানের উৎসব আর লন্ডনি যোগসূত্র, সঙ্গে সম্মান রেখে বেড়ানোর পরামর্শ।