২০২৬ সালের নৌ-নিয়মে টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, বারিক্কা টিলার নিচে যাদুকাটা আর হাছন রাজা ও শাহ আবদুল করিমের ভিটা, সঙ্গে তিন দিনের ভ্রমণপথ।
এই অধ্যায়ে
সুনামগঞ্জ সিলেট বিভাগের নিচু, পানিঘেরা কোণ। বছরের বড় একটা সময় জেলার অনেকখানি থাকে পানির নিচে: নদীর মাঝের বিশাল বাটির মতো নিচু ভূমি, যাকে বলে হাওর, বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভরে ওঠে; তখন গ্রামগুলো জেগে থাকে দ্বীপের মতো, আর রাস্তার জায়গা নেয় নৌকা। শীতে পানি নেমে গেলে সেই জমিই প্রথমে সবুজ, পরে ধানে সোনালি হয়ে ওঠে।
উত্তর সীমানা বরাবর সমতল থেকে সোজা উঠে গেছে মেঘালয়ের পাহাড়, আর সেখান থেকে স্বচ্ছ, খরস্রোতা হয়ে নেমে এসেছে যাদুকাটার মতো নদী। এই অধ্যায়ে আছে হাওরাঞ্চল আর সীমান্তের পাহাড়, সুরমার তীরের সুনামগঞ্জ শহর, আর বাংলা লোকগানের দুই মহান কবি হাছন রাজা ও শাহ আবদুল করিম, যাঁদের গান গাওয়া হয় সারা বাংলাদেশে।
ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষ
১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলা হয়। উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের নিচু ভূমি পর্যন্ত এর বিস্তার, আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পুরো জেলাই হাওরাঞ্চল। হাওর শব্দটিকে সাধারণত সাগর শব্দের স্থানীয় উচ্চারণ বলে ব্যাখ্যা করা হয়, আর আগস্টে হাওরগুলো দেখতে ঠিক সাগরের মতোই।
এই অঞ্চল ছিল প্রাচীন লাউড় রাজ্যের অংশ, আর যাদুকাটার কাছের নবগ্রামকে হিন্দু ধর্মগুরু অদ্বৈত আচার্যের জন্মস্থান হিসেবে মানা হয়; কাছেই নদীতে পণাতীর্থের স্নানোৎসব পাঁচ শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে বলে কথিত। ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে সিলেট জয়ের পর শাহ কামাল কুহাফা শাহারপাড়ায় তাঁর কেন্দ্র গড়েন; পরে অঞ্চলটি স্থানীয় সুলতান, মোগল ও ব্রিটিশদের হাতে যায়। বিস্তারিত পড়ুন সিলেটের ইতিহাস।
১৯৭১ সালে এই জেলা অনেক কষ্ট সয়েছে। ৩১ আগস্ট শ্রীরামপুর উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক সভায় গুলি চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১২৬ জনকে হত্যা করে, আর ৭ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত হয়। এই জেলার মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি পরে বীর প্রতীক খেতাব পান।
সবকিছুর ওপরে সুনামগঞ্জের পরিচয় গানে। হাছন রাজা আর শাহ আবদুল করিম ছাড়াও এই জেলা দেশকে দিয়েছে নির্মলেন্দু চৌধুরীর মতো শিল্পী, আর লোকগান এখানে এখনো জীবন্ত ঐতিহ্য। আরও জানতে দেখুন মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি।
হাওরের বারো মাস
এখানে জীবন চলে পানির ছন্দে। বর্ষায় বৃষ্টি আর ভারতের পাহাড় থেকে নামা ঢলে নদী ফুলে ওঠে, আর সাত-আট মাস হাওর ডুবে থাকে ৬ মিটার পর্যন্ত গভীর পানিতে। গ্রামগুলো হয়ে ওঠে দ্বীপ, যাতায়াত চলে নৌকায়, আর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় মাছ ধরা; হাওর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যক্ষেত্রগুলোর একটি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর জোরালো বাতাসে এমন ঢেউ ওঠে যে বসতভিটার ক্ষতি হতে পারে।
শীতে পানি নামলে জেগে ওঠা মাটিতে কৃষকেরা বোরো, অর্থাৎ শুকনো মৌসুমের ধান, লাগান। হাওরের অনেক পরিবারের কাছে এটিই বছরের একমাত্র ফসল, তাই এপ্রিল-মে মাসের ধানকাটাই ঠিক করে দেয় পরের বারো মাস কেমন যাবে। আগাম বন্যা ঠেকাতে মাঠ ঘিরে থাকে মাটির বাঁধ, আর বাঁধ ভাঙলে ক্ষতি হয় সঙ্গে সঙ্গে।
এ কারণেই আগাম ঢল হাওরের সবচেয়ে বড় ভয়। ২০১৭ সালের মার্চের শেষে, ধানকাটার কয়েক সপ্তাহ আগে, ভারী বৃষ্টি আর সীমান্তের ওপারের পাহাড়ি ঢলে ছয় জেলায় বাঁধ উপচে ও ভেঙে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুনামগঞ্জ: ডেইলি স্টারের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বোরোর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর ডুবে যায়, আর প্রায় ১ লাখ হেক্টর পুরোপুরি নষ্ট হয়। বিপুল মাছ আর হাঁস মারা যায়, পরিবারগুলো গরু আর দামি জিনিস বিক্রি করে, আর যে কৃষকেরা ধান ফলান, তাঁরাই ভর্তুকির চালের জন্য লাইনে দাঁড়ান।
২০২২ সালের জুনে আসে অন্য রকম এক বন্যা, মেঘালয়ের কিছু অংশে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির পর। সুনামগঞ্জ শহরের প্রায় ৯৪ শতাংশ ডুবে যায়, রাস্তা আর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়, আর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আনুমানিক ৭২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বড় বন্যার পর গেলে ভাঙা রাস্তা আর ধীর যাত্রার জন্য প্রস্তুত থাকুন, আর আগে পড়ে নিন বর্ষায় সিলেট।


সুনামগঞ্জ শহর ও হাছন রাজা
সুনামগঞ্জ শহর সুরমার তীরে, ১৯৬০ সাল থেকে পৌরসভা। এটি মূলত বাজার আর প্রশাসনিক কেন্দ্র, বেশির ভাগ পর্যটকের কাছে বাস থেকে নেমে মোটরসাইকেল বা নৌকা ধরার জায়গা; তবে সন্ধ্যায় নদীর পাড় মনোরম, আর শহরে এমন একটি জায়গা আছে যার জন্য একটা সকাল রাখা যায়।
সেটি হাছন রাজার বাড়ি। ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর পুরোনো লক্ষ্মণশ্রী পরগনার তেঘরিয়ায় এক মুসলিম জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। প্রায় ৪০ দিনের ব্যবধানে বড় সৎভাই আর বাবার মৃত্যুর পর অল্প বয়সেই তাঁকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়। তিনি স্কুল আর মসজিদ গড়েছেন, জনকল্যাণে জমি দান করেছেন, পোষা পাখি আর পশুর পেছনে খরচ করেছেন অঢেল; আর সুফিবাদে শেকড় গাঁথা তাঁর কবিতা আত্মার প্রশ্নগুলোকে এমন গানে রূপ দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষও গাইতে পারে।
তাঁর গান সংকলিত হয়েছে হাছন উদাস ও শৌখিন বাহার গ্রন্থে, আর হাছন রাজা সমগ্রে আছে প্রায় ৫০০ কবিতা ও গান। ১৯৩০ সালের হিবার্ট বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে পূর্ববাংলার এক গ্রাম্য কবি হিসেবে আলোচনা করেন, আর অনেক পরে লেখক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে তাঁর গান ব্যবহার করে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেন। ১৯২২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়: বেশির ভাগ সূত্রে তারিখ ৬ ডিসেম্বর, কোনো কোনো সূত্রে ৭ বা ৮ ডিসেম্বর, আর বাংলাপিডিয়ার একটি সংস্করণে নভেম্বর।
পরিবারের বাড়িটি তেঘরিয়ায় সুরমার তীরে, ফটকে লেখা হাছন রাজার বাড়ি। তাঁর নিজের ছনের ঘরটি ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়; এখনকার ভবনগুলো পরবর্তী প্রজন্মের তৈরি। ২০১০ সালে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক যখন যান, তখন পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণে থাকা ছোট জাদুঘরে ছিল তাঁর চেয়ার-টেবিল, ছড়ি, পোশাক, পাখির খাঁচা, তলোয়ার, খড়ম আর হাতে লেখা গানের কপি; বাড়ির কাছেই তাঁর কবর। সিলেট শহরের রাজাকুঞ্জে মিউজিয়াম অব রাজাস-এও এই পরিবারের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
জাদুঘরটি একটি পারিবারিক বাড়ির অংশ। যাওয়ার আগে শহরে খোঁজ নিন কখন খোলা থাকে, শালীন পোশাক পরুন, আর কবরের কাছে যেকোনো প্রার্থনার স্থানের মতোই আচরণ করুন।
ছাতক
সুরমার উজানে ছাতক জেলার শিল্পশহর। এখানকার সিমেন্ট কারখানা ১৯৩৭ সালে আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে; ১৯৮২ সালের ১ জুলাই থেকে এটি চালায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, আর কাঁচামালের জন্য কারখানাটি নির্ভর করে এসেছে মেঘালয় থেকে আমদানি করা চুনাপাথরের ওপর। বেশির ভাগ পর্যটকের জন্য এখানে দেখার মতো তেমন কিছু নেই।

শাহ আবদুল করিম ও উজানধল
দেশজুড়ে বাউল সম্রাট নামে পরিচিত শাহ আবদুল করিমের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, দিরাই উপজেলায়। বাউল রশিদ উদ্দিন ও শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশের কাছে তাঁর তালিম, আর প্রেম, সাম্য, মানবিকতা ও বিশ্বাস নিয়ে তিনি লিখেছেন ১,৬০০টির বেশি গান। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক পান, আর ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর জীবন জড়িয়ে আছে কালনী নদী আর তার তীরের উজানধল গ্রামের সঙ্গে, যেখানে ১৯৫৭ সাল থেকে তিনি বাস করেছেন, গানও বেঁধেছেন। তাঁর দুটি বইয়ের নামেই আছে নদীটি: কালনীর ঢেউ (১৯৮১) আর কালনীর কূলে (২০০১)। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না কিংবা কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধুর মতো গান সারা বাংলাদেশে পরিচিত।
উজানধল নদীর ধারের এক নিরিবিলি গ্রাম, জাদুঘর নয়। যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় দুই দিনের শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব, যা শাহ আবদুল করিম পরিষদ (সভাপতি তাঁর ছেলে শাহ নূর জালাল) ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর, সাধারণত ফেব্রুয়ারিতে, সেখানে আয়োজন করে। দিরাই সুনামগঞ্জ শহরের দক্ষিণে; এখনকার পথ কেমন, বিশেষ করে বন্যার পরে, স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
নৌকায় টাঙ্গুয়ার হাওর
টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, আর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণও। মেঘালয়ের পাহাড়ের নিচে তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় এর বিস্তার (পুরোনো সূত্রে ধর্মপাশা)। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৪৬টি গ্রামসহ প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার, ছোট-বড় প্রায় ১২০টি বিল, আর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৫৪টি পরস্পরযুক্ত বিল এবং হাওর ও আশপাশে ৮৮টি গ্রামের কথা বলা হয়; রামসার সাইট হিসেবে এর আয়তন ৯,৫০০ হেক্টর। ১৯৯৯ সালে একে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়, আর ২০০০ সালের ১০ জুলাই এটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ রামসার জলাভূমির তালিকায় ওঠে। এখানে আছে ১৪০ প্রজাতির বেশি মিঠাপানির মাছ, রামসারের তথ্যমতে অন্তত ২০৮ প্রজাতির পাখি, যার ৯৮টি পরিযায়ী, আর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে হিজল-করচ। হাওরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তেল-গ্যাস কূপ খনন নিষিদ্ধ।
চিরচেনা ভ্রমণ বলতে এতদিন বোঝাত তাহিরপুর থেকে এক বা দুই রাতের হাউসবোট যাত্রা, নৌকাতেই রান্না হতো খাবার। হাউসবোটের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালে এক পরিবেশকর্মীর হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ২০০টিতে, আর প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ আর নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের খবরে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালের ২২ জুন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাওরের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও এর আশপাশের এলাকায় হাউসবোট চলাচল বন্ধ করা হয়। ২০২৬ সালের ২ আগস্ট প্রশাসন আরও এক ধাপ এগোয়: টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫-এর আওতায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সব হাউসবোট ও পর্যটক নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়, আর হাওরে চলা প্রতিটি নৌযানের মালিক ও পরিচালনাকারীকে জেলা প্রশাসনে নিবন্ধন করতে বলা হয়। সেই মাসের শেষে প্রথম আলোর এক ভ্রমণ প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যটকবাহী নৌকা তখনো মাটিয়ান হাওর হয়ে বৌলাই নদী ধরে টেকেরঘাট পর্যন্ত যেতে পারে; বুকিংয়ের আগে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন।
২০২৬ সালের আগস্টের বিজ্ঞপ্তিতে পর্যটকবাহী নৌযানের জন্য কিছু নিয়মও বেঁধে দেওয়া হয়েছে:
- হাওরে চলা প্রতিটি নৌযানকে জেলা প্রশাসনে নিবন্ধিত হতে হবে (সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট); নিবন্ধনহীন নৌকায় উঠবেন না।
- নৌকায় উচ্চ শব্দে গান, মাইক বা পার্টি চলবে না।
- একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, পানিতে কিছুই ফেলা যাবে না; হাউসবোটে সেপটিক ট্যাংক, অন্তত দুটি ডাস্টবিন আর পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার থাকতে হবে।
- প্রতিটি নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে, আর প্রতিটি যাত্রার আগে আচরণবিধি বুঝিয়ে বলতে হবে।
- হাউসবোট ১০০ ফুটের বেশি লম্বা হতে পারবে না।
- ঝড়, ভারী বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় কোনো যাত্রা নয়।
- ২০২৫ সালের জুনে জারি করা পর্যটক নির্দেশনায় মাছ ধরা, শিকার, ডিম সংগ্রহ, গাছ কাটা, আগুন জ্বালানো আর ডিটারজেন্ট ব্যবহারও নিষিদ্ধ, আর বন্যপ্রাণী দূর থেকে দেখতে বলা হয়েছে।
২০২৫ সালে নিয়ম কড়া করা হয়, ২০২৬ সালে আবারও; সামনে আরও বদলাতে পারে। বুক করার আগে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখুন, পরিচালনাকারীর কাছে নিবন্ধনের কাগজ চান, আর এমন কাউকে বেছে নিন যিনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বুঝিয়ে বলতে পারেন। কেবিন, খরচ আর কী নেবেন, তা জানতে দেখুন আমাদের টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট গাইড।
ভরা হাওরের মৌসুম জুন থেকে অক্টোবর। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি হাওর ছোট হয়ে আসে, নৌকা কমে, আর আসে পরিযায়ী হাঁস। ঈদ আর শুক্রবারের রাতের জন্য কয়েক সপ্তাহ আগে বুক করুন।

টেকেরঘাট ও নীলাদ্রি লেক
তাহিরপুরের সীমান্তে টেকেরঘাটে মেঘালয়ের পাহাড় নেমে এসেছে একেবারে সমতলে। এখানে বিপুল পরিমাণ চুনাপাথর তোলা হয়েছিল, আর পরিত্যক্ত গভীর খনিটি ভরে গেছে পানিতে। সেটিই নীলাদ্রি লেক: ঘাসে ঢাকা ঢিবির মাঝে নীল পানি, ওপারের ঢালে সবুজ পাহাড় আর সীমান্তের কাঁটাতার। এর আনুষ্ঠানিক নাম শহীদ সিরাজ লেক, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের নামে, যিনি ১৯৭১ সালে সাচনা বাজার ও জামালগঞ্জ এলাকা মুক্ত করার লড়াইয়ে শহীদ হন এবং পরে বীর বিক্রম খেতাব পান।
টেকেরঘাটে রাতে নৌকা নোঙর করে, আর সূর্যাস্ত দেখতে সবাই ঢিবিতে ওঠেন। লেকটি সারা বছরই দেখা যায়। শুকনো মৌসুমে সড়কপথেও আসা যায়: ২০২১ সালের এক গাইডে সুনামগঞ্জ থেকে রিজার্ভ মোটরসাইকেলের ভাড়া বলা হয়েছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, তবে ভাড়া বদলায়, তাই রওনা দেওয়ার আগে দরদাম ঠিক করে নিন। বারিক্কা টিলা আর যাদুকাটা এখান থেকে অল্প পথ।
লেকটি কিনারা থেকেই গভীর। সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না, ভালো সাঁতারুরাও পাড়ের কাছাকাছি থাকুন। সীমান্তের কাঁটাতার থেকে দূরে থাকুন এবং বিজিবির নির্দেশ মানুন।

লাউড়, যাদুকাটা, বারিক্কা টিলা ও শিমুল বাগান
টেকেরঘাটের পূর্বে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বেরিয়ে যাদুকাটা ছড়িয়ে পড়েছে বালু আর পাথরের চওড়া বুকে। এর দুই তীর প্রাচীন লাউড়ের মাটি, আর নদীর এই ছোট অংশেই জেলার প্রিয় তিনটি গন্তব্য।
বারিক্কা টিলা
বারিক্কা টিলা নদীর ওপরে ঘাসে ঢাকা এক টিলা; অল্প চড়াই ভেঙে উঠলেই দেখা যায় পাহাড় থেকে বাঁক নিয়ে বেরিয়ে আসা যাদুকাটা। যান সূর্যোদয়ে, যখন প্রায়ই পানির ওপর কুয়াশা থাকে, অথবা বিকেলের শেষে। কাছেই কয়েকটি সাধারণ খাবারের হোটেল, এখান থেকে নদীর ধার ধরে মোটরসাইকেল যায় টেকেরঘাটে, আর ছোট নৌকায় মানুষ ও মোটরসাইকেল যাদুকাটা পার হয়। ২০২১ সালের এক গাইডে মোটরসাইকেলের ভাড়া বলা হয়েছিল প্রায় ১২০ টাকা আর নদী পারাপার কয়েক টাকা; এখনকার ভাড়া আগে থেকে ঠিক করে নিন।
পণাতীর্থ ও শাহ আরেফিন (রহ.)
প্রতি বছর চৈত্রের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে, মার্চ বা এপ্রিলে, হিন্দু পুণ্যার্থীরা পণাতীর্থে যাদুকাটায় স্নান করেন, যা মহাবারুণী বা গঙ্গাস্নান নামেও পরিচিত। বিশ্বাস আছে, সেদিন সাত সাগরের জল এসে মেশে এই নদীতে, তাই এখানে স্নান গঙ্গাস্নানের মতোই পুণ্যের। পুণ্যার্থীরা অদ্বৈত আচার্যের জন্মস্থান নবগ্রামেও সমবেত হন, আর নদীর ধারে বসে বারুণী মেলা। একই সময়ে নদীর পূর্ব তীরে লাউড়েরগড় গ্রামে সুফি সাধক শাহ আরেফিন (রহ.)-এর মাজারে তিন দিনের ওরস ও মেলায় সাধারণত আলাদা ভিড় জমে। ঐতিহ্যগতভাবে লাখো মানুষ এসব আয়োজনে আসেন।
পণাতীর্থ আর ওরসের সময় রাস্তা ও নৌকায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে। শালীন পোশাক পরুন, স্নানরত পুণ্যার্থীদের থেকে সম্মানজনক দূরত্ব রাখুন, আর পানিতে থাকা মানুষের ছবি তুলবেন না।
শিমুল বাগান
তাহিরপুরের মানিগাঁওয়ে যাদুকাটার কাছে শিমুল গাছের বাগান শিমুল বাগান। ২০০২ সালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন প্রায় ৩,০০০ চারা লাগান, আর বাগানটি দেখাশোনা করে তাঁর পরিবার। ফাল্গুন-চৈত্রে, মোটামুটি মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে, ডাল আর নিচের মাটি লাল ফুলে ঢেকে যায়। ফুলের মৌসুমের বাইরে এটি শুধুই এক ছায়াঘেরা বাগান। শুক্রবারের চেয়ে সপ্তাহের অন্য দিনের সকাল অনেক নিরিবিলি।


খাবার, থাকা ও যাতায়াত
কী খাবেন
হাওরের খাবার মানেই মাছ। শুধু টাঙ্গুয়ারেই ১৪০টির বেশি প্রজাতি, যার মধ্যে বেশি মেলে আইড়, বাইম, টেংরা, গুলশা আর তিতনা, কাকিয়ার মতো ছোট মাছ; এখানকার রান্নায় এগুলো আসে ভাজা, পাতলা ঝোল বা ভর্তা হয়ে। হাওরে হাঁসও পালা হয়, স্থানীয় খাবারের তালিকায় তাই হাঁসের মাংসও থাকে। পরিযায়ী পাখি সংরক্ষিত, তা কখনো খাবেন না, আর বুনো প্রাণীর মাংস মনে হলে বিনয়ের সঙ্গে না বলুন। সিলেটি খাবার নিয়ে জানতে দেখুন খাবার ও চা।
কোথায় থাকবেন
জেলার প্রধান হোটেল আর গেস্টহাউসগুলো সুনামগঞ্জ শহরে, ভোরে রওনা দেওয়ার জন্য সুবিধাজনক। শহরের বাইরে থাকার জায়গা কম, তাই ২০২৬ সালের নিষেধাজ্ঞার আগে টাঙ্গুয়ার আর টেকেরঘাটে যাওয়া বেশির ভাগ পর্যটক রাত কাটাতেন হাউসবোটে। শুকনো মৌসুমে কেউ কেউ সুনামগঞ্জে থেকে মোটরসাইকেলে দিনে দিনে ঘুরে আসেন। দেখুন সুনামগঞ্জে থাকার জায়গা।
কীভাবে যাবেন
বেশির ভাগ মানুষ আসেন সিলেট হয়ে, সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কে বাসে বা ভাড়া গাড়িতে। ঢাকার সায়েদাবাদ ও মহাখালী থেকেও সরাসরি বাস আছে; ২০২১ সালের এক গাইডে সময় বলা হয়েছিল প্রায় ৬ ঘণ্টা আর ভাড়া প্রায় ৫৫০ টাকা, তাই এখনকার ভাড়া জেনে নিন। সুনামগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেলপথ নেই, তবে বর্ষায় কেউ কেউ ঢাকা থেকে রাতের ট্রেনে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকে সড়ক ও নৌপথে হাওর পাড়ি দিয়ে টেকেরঘাটে আসেন। পথটির বর্ণনা ওই ২০২১ সালের গাইডেরই, আর ২০২৬ সালের নৌ-নিষেধাজ্ঞায় এতে বাধা পড়তে পারে, তাই ভরসা করার আগে খোঁজ নিন।
কীভাবে ঘুরবেন
সুনামগঞ্জ শহরে সুরমার বড় সেতুর কাছ থেকে মোটরসাইকেল ও সিএনজি যায় তাহিরপুর, বারিক্কা টিলা আর টেকেরঘাটে। রওনা দেওয়ার আগে ভাড়া আর কোথায় কোথায় থামবেন তা ঠিক করে নিন, আর হেলমেট চেয়ে নিন। যেখানে চলার অনুমতি আছে, সেখানে হাউসবোট ছাড়ে তাহিরপুরের ঘাটগুলো থেকে, সাহেববাড়ি ঘাট তার একটি; বর্ষায় সেখান থেকে ঘণ্টা বা দিন হিসেবে ছোট ইঞ্জিন নৌকাও ভাড়া পাওয়া যায়। শীতে পানি কম থাকায় ঘোরার বেশির ভাগটাই হয় সড়কপথে। বিস্তারিত পাবেন যাতায়াত ও ঘোরাঘুরি অধ্যায়ে।
তিন দিনের ভ্রমণপথ
প্রথম দিন: সুনামগঞ্জ শহর থেকে তাহিরপুর
ভোরে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ শহরের পথে রওনা দিন। তেঘরিয়ায় হাছন রাজার বাড়ি ও জাদুঘর দেখে সুরমার পাড় ধরে হাঁটুন, তারপর বিকেলে তাহিরপুরে যান। বর্তমান নিয়মে আপনার পথে অনুমতি থাকলে তবেই নিবন্ধিত নৌকায় উঠুন; না থাকলে, আর শুকনো মৌসুমে, রাতটা শহরেই কাটান।
দ্বিতীয় দিন: জলপথে টেকেরঘাট
দিনটা কাটান পানিতে। ২০২৬ সালের আগস্টের নিষেধাজ্ঞার পর পর্যটকবাহী নৌকা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার বাইরে দিয়ে, মাটিয়ান হাওর হয়ে বৌলাই নদী ধরে টেকেরঘাটে যায় বলে খবর; রওনা দেওয়ার আগে পথটা নিশ্চিত হয়ে নিন। সাঁতার কাটলে লাইফ জ্যাকেট পরে, শান্ত পানিতে, নৌকার পাশেই কাটুন, আর রাতে নৌকা নোঙর করার আগে নীলাদ্রি লেকের ঢিবিতে উঠে সূর্যাস্ত দেখুন।
তৃতীয় দিন: বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান, তারপর ফেরা
ভোরে মোটরসাইকেলে বারিক্কা টিলায় গিয়ে যাদুকাটার দৃশ্য দেখুন, নদী পার হয়ে শিমুল বাগান (মোটামুটি মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে ফুলে ভরা), তারপর লাউড় হয়ে সড়কপথে সুনামগঞ্জ ও সিলেটে ফিরুন।
চতুর্থ দিন হাতে থাকলে, বা ফেব্রুয়ারিতে এলে, শাহ আবদুল করিম উৎসবের জন্য দিরাইয়ের উজানধল যোগ করুন। শুকনো মৌসুমে সুনামগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে দুটি লম্বা দিনে পুরো পথ ঘোরা যায়। মৌসুম অনুযায়ী পরিকল্পনার জন্য দেখুন কখন যাবেন।
হাওরে নিরাপত্তা
হাওর একেবারে খোলা, আর খারাপ আবহাওয়ায় এটাই একে বিপজ্জনক করে তোলে। জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যান, যাঁদের অনেকেই খোলা জায়গায় কাজ করা কৃষক, আর নিচু, সমতল হাওরে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা কম: ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষে দুই দিনে কয়েকটি জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১১ জন মারা যান, যাঁদের মধ্যে ছিলেন সুনামগঞ্জ সদরের হাওরে ধান কাটতে থাকা দুই কৃষক। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর জোরালো বাতাসে খোলা পানিতে উঁচু ঢেউ উঠতে পারে।
- যেকোনো নৌযাত্রার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখুন, ঝড়ের আশঙ্কা থাকলে বেরোবেন না; ঝড়, ভারী বৃষ্টি আর বজ্রপাতের সময় এখন নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নিয়ম আছে।
- বজ্রপাত শুরু হলে পানি থেকে উঠে আসুন, উঁচু গাছ থেকে দূরে থাকুন। পাকা ভবনই সবচেয়ে নিরাপদ; তা না থাকলে শুয়ে না পড়ে নিচু হয়ে বসে থাকুন।
- ডেকে আর ছোট নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরুন, শিশুদের বসিয়ে রাখুন, আর শুধু শান্ত পানিতে নৌকার পাশেই সাঁতার কাটুন।
- বসন্তে পাহাড়ে ভারী বৃষ্টির পর আগাম ঢল নামতে পারে, হাওরের রাস্তা আর পারাপার দ্রুত ডুবে যেতে পারে; রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিন।
- টেকেরঘাট, বারিক্কা টিলা আর যাদুকাটা সীমান্ত এলাকা। বাংলাদেশের অংশে থাকুন, পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন এবং বিজিবির নির্দেশ মানুন।
- হাওরের গ্রামগুলো ঘনিষ্ঠ ও রক্ষণশীল। শালীন পোশাক পরুন, মানুষের, বিশেষ করে নারীদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, আর গ্রাম, মসজিদ ও মন্দিরের কাছে গানের শব্দ কম রাখুন।
- প্রতিটি টুকরো আবর্জনা শহরে ফিরিয়ে আনুন।
বিভাগজুড়ে দায়িত্বশীলভাবে ঘোরার আরও পরামর্শ পাবেন দায়িত্বশীল ভ্রমণ অধ্যায়ে।
তথ্যসূত্র
এই গাইডের তথ্য অক্টোবর ২০২৬-এ নিচের সূত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়, তাই খোলার সময়, ভাড়া ও নিয়মকানুন স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
- Banglapedia: Haor (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Tanguar Haor (en.banglapedia.org)
- Banglapedia: Sunamganj District (en.banglapedia.org)
- Wikipedia: Sunamganj District (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Tanguar Haor (en.wikipedia.org)
- Wikipedia: Hason Raja (en.wikipedia.org)
- The Financial Express: Hasan Raja's home (2010) (today.thefinancialexpress.com.bd)
- Wikipedia: Shah Abdul Karim (en.wikipedia.org)
- Prothom Alo English: Two-day Shah Abdul Karim Loko Utshob 2025 to begin 7 February (en.prothomalo.com)
- Wikipedia: Chhatak Cement Factory (en.wikipedia.org)
- Dhaka Tribune: Houseboat, tourist vessels banned in Tanguar Haor's ecological critical area (2026) (dhakatribune.com)
- Prothom Alo English: Haor trip, know these 13 guidelines before planning your journey (2026) (en.prothomalo.com)
- Prothom Alo English: Tanguar Haor report sparks public outcry, leads to regulatory action (2025) (en.prothomalo.com)
- UNB: Visit Niladri Lake, Sunamganj (2021) (unb.com.bd)
- Wikipedia: Shimul Garden (en.wikipedia.org)
- bdnews24: Panatirtha bathing festival on the Jadukata (2025) (bangla.bdnews24.com)
- The Daily Star: Growers now buyers (2017) (thedailystar.net)
- ReliefWeb: Bangladesh floods in north-east haor areas, April–May 2017 (reliefweb.int)
- IFRC: Millions in Bangladesh impacted by one of the worst floodings ever seen (2022) (ifrc.org)
- Dhaka Tribune: Lightning deaths rise as rural Bangladesh lacks shelters, awareness (2026) (dhakatribune.com)
- Prothom Alo English: Ban on entry of houseboats in Tanguar haor's watchtower area (2025) (en.prothomalo.com)
- Ramsar Sites Information Service: Tanguar Haor (site 1031) (rsis.ramsar.org)